ডেইলি ডোমকল, নয়াদিল্লি: ভারতের অন্যতম প্রাচীন ভৌগোলিক সম্পদ এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের মরুবিস্তার রোধের প্রধান ঢাল আরাবল্লী পর্বতমালাকে বাঁচাতে এক বিশাল আন্দোলনের ডাক দিলেন পরিবেশবিদ ও স্থানীয় বাসিন্দারা। এই পর্বতমালাকে রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে শুরু হচ্ছে ‘আরাবল্লী সংরক্ষণ যাত্রা’—যা প্রায় ৭০০ কিলোমিটারের একটি দীর্ঘ পদযাত্রা। পরিবেশবিদ, পরিবেশ বিজ্ঞানী, আইনজীবী, গবেষক এবং দিল্লি, হরিয়ানা, রাজস্থান ও গুজরাটের স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে গঠিত ‘আরাবল্লী বিরাসত জন অভিযান’-এর পক্ষ থেকে এই যাত্রার ঘোষণা করা হয়েছে।
আগামী ২৪ জানুয়ারি গুজরাটের আরাবল্লী জেলা থেকে এই যাত্রা শুরু হবে। গুজরাটের ৩টি জেলা, রাজস্থানের ২৭টি জেলা এবং হরিয়ানার ৭টি জেলা অতিক্রম করে ৪০ দিনেরও বেশি সময় পর এই পদযাত্রা দিল্লিতে গিয়ে শেষ হবে।
সম্প্রতি আদালতের কিছু নির্দেশ এবং সরকারি নীতির পরিবর্তনের ফলে আরাবল্লীর অস্তিত্ব নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২০ নভেম্বর ২০২৫-এর এক রায়ে সুপ্রিম কোর্ট আরাবল্লীর একটি ‘সংকীর্ণ সংজ্ঞা’ অনুমোদন করেছিল, যার ফলে পাহাড়ের একটি বড় অংশ খনি খনন ও উন্নয়নের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার পথে ছিল। তবে ব্যাপক জনরোষের মুখে ২৯ ডিসেম্বর আদালত সেই নির্দেশে স্থগিতাদেশ দেয় এবং গত ২১ জানুয়ারি এক শুনানিতে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়।
আরাবল্লী বিরাসত জন অভিযানের সদস্য নীলম আহলুওয়ালিয়া বলেন, “সংবিধানের ৫১এ(জি) ধারা অনুযায়ী প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র কর্তব্য। গত কয়েক দশক ধরে বনভূমি নিধন, বৈধ-অবৈধ খনন এবং রিয়েল এস্টেট ব্যবসার কারণে আরাবল্লী আজ ক্ষতবিক্ষত। পাহাড় কেটে সমতল করে দেওয়া হচ্ছে এবং বর্জ্য ফেলে বিষাক্ত করা হচ্ছে ভূগর্ভস্থ জল।”
আন্দোলনকারীদের দাবি, ২০ নভেম্বর ২০২৫-এর রায়টি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে। পশ্চিমঘাট পর্বতমালার মতো আরাবল্লীকেও ‘পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকা’ (ESA) হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। বিশেষজ্ঞ কমিটিতে খনি খননের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বিখ্যাত জলপুরুষ ড. রাজেন্দ্র সিং দাবি তুলেছেন যে, আরাবল্লীকে ‘ক্রিটিক্যাল ইকোলজিক্যাল জোন’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে এবং এই প্রাচীনতম পাহাড়ের ‘অধিকার’ স্বীকৃত হতে হবে।
রাজস্থানের কোটপুতলি জেলার স্থানীয় কর্মী প্রভু দয়াল জানান, এনজিটি-র (NGT) কড়া নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও খনি ও ক্রাশারের কাজ থামেনি। ফলে গ্রামবাসীরা হাঁপানি, বধিরতা এবং চর্মরোগের মতো মারাত্মক সমস্যায় ভুগছেন। অন্যদিকে, সিকারের কর্মী কৈলাশ মিনার মতে, খনি এলাকার ভূগর্ভস্থ জলস্তর ১০০০ থেকে ২০০০ ফুট নিচে নেমে গেছে।
আদিবাসী একতা পরিষদের কুসুম রাওয়াত বলেন, “আমরা আরাবল্লীকে দেবতা হিসেবে পূজা করি। খনি বা রিসোর্ট বানানোর নামে প্রকৃতি ধ্বংস করাকে ‘উন্নয়ন’ বলা যায় না। আমরা আমাদের পাহাড় ও বন ধ্বংস হতে দেব না।” এই যাত্রার মূল লক্ষ্য হলো প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছানো, পাহাড়ের বর্তমান দুরবস্থা নথিবদ্ধ করা এবং একটি শক্তিশালী জনমত গড়ে তোলা। উত্তর-পশ্চিম ভারতের কোটি কোটি মানুষের জল ও বাতাসের একমাত্র রক্ষাকবচ আরাবল্লীকে বাঁচানোই এখন এই আন্দোলনের মূল সুর।
