TOP NEWS

বাংলাদেশকে ইসরায়েলি ধাচে ‘শিক্ষা দেওয়া উচিত’, গণহত্যা চালাতে উস্কানি শুভেন্দুর!

(LOP Suvendu Adhikari || Photo Courtesy: X)

ডেইলি ডোমকল, কলকাতা: অশান্ত বাংলাদেশ। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান বিন হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে পড়শি দেশে। দফায় দফায় বিভিন্ন জায়গায় অগ্নিসংযোগ, পুলিশ-জনতা খণ্ডযুদ্ধ, প্রতিবাদ-বিক্ষোভে কার্যত অস্থির ইউনূস সরকার। এই অশান্তির আবহে সংখ্যালঘু যুবক দীপু দাস-কে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগে প্রতিবাদ ও আন্দোলন আছড়ে পড়ে দিল্লি, কলকাতা, আগরতলা সহ অন্যান্য শহরে। দীপু দাসের হত্যা নিয়ে ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছেন বাংলার বিরোধী দলনেতা ও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। বেনজির ভাষায় ঢাকাকে আক্রমণ করেছেন তিনি। বাংলাদেশকে ইসরায়েলি ধাচে ‘শিক্ষা দেওয়া উচিত’—এমন মন্তব্য করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন শুভেন্দু অধিকারী।

শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বিরোধী দলনেতা বলেন, “এদের শিক্ষা দিতে হবে, ঠিক যেমন ইসরায়েল গাজাকে শিক্ষা দিয়েছে। আমাদের ১০০ কোটি হিন্দু এবং হিন্দুদের স্বার্থে কাজ করা সরকারকে অবশ্যই তাদের উচিত শিক্ষা দিতে হবে। ঠিক যেমন আমরা অপারেশন সিন্দুর চালিয়ে পাকিস্তানকে শিক্ষা দিয়েছি।” প্রসঙ্গত, দীর্ঘ সময় ধরে ফিলিস্তিনে নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরেও থামেনি রক্তপাত। ইসরায়েলের লাগাতার বর্বরোচিত হামলায় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় মোট নিহত হয়েছে ৭০,৩৬০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি। আহতের সংখ্যা পৌঁছেছে ১,৭১,০৪৭ জনে। তাহলে কি রাজ্যের বিরোধী দলনেতা পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের মতো বাংলাদেশেও গণহত্যা চালানো ও মুসলিম নিধন করতে বললেন? শুভেন্দুর মন্তব্য সেদিকেই ইঙ্গিত করছে।

 

শুভেন্দু অধিকারীর ‘ইসরায়েলি ধাচে শিক্ষা’ দেওয়ার মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল। বিজেপি ‘ঘৃণা ও অসহিষ্ণুতাকে শিল্পে পরিণত করেছে’ বলে তোপ দেগেছে ঘাসফুল শিবির। এক্স পোস্টে তৃণমূল বলেছে, “তাদের বিষোদ্গারকারী মুখপাত্র শুভেন্দু আবারও ফ্যাসিবাদী দাঁত দেখালেন। ইসরায়েল যেমন গাজাকে ‘শিক্ষা দিয়েছে’, তেমনই মুসলিমদের শিক্ষা দেওয়ার ডাক দিয়ে তিনি প্রকাশ্য গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের আহ্বান জানালেন। তাঁর নগ্ন বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের পরও কোনও এফআইআর নেই, কোনও গ্রেপ্তার নেই, কোনও মামলা নেই। এমনকি এই হবু হিটলারের বিরুদ্ধে কোনো ইউএপিএ প্রয়োগ করা হয়নি।”

বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনে বিক্ষোভ

সূত্রের খবর, শুক্রবার (২৫ ডিসেম্বর) পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিজেপি নেতা ও বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠক শেষে তিনি দাবি করেন, তাঁর অধিকাংশ প্রশ্নেরই কোনও সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি কূটনীতিকরা। শুভেন্দু বলেন, “আমি তাঁদের জিজ্ঞেস করেছি, প্রাক্তন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি মুসলিম হওয়ায় মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারে আশ্রয় দিতে পারেন, তাহলে সে দেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের কেন নির্বিচারে নিশানা করা হচ্ছে? যদি তারা মনে করে, সে দেশের দুই কোটি হিন্দু লাগাতার নিপীড়নের শিকার হবে, আর এপারে সীমান্তে থাকা ১০০ কোটি হিন্দু চুপচাপ বসে দেখবে, তাহলে তারা মারাত্মক ভুল করছে।”

ডেপুটি হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে পুলিশের লাঠিচার্জ ও গ্রেপ্তারির ঘটনায় বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকেও তীব্র আক্রমণ করেন তিনি। বিজেপি নেতার বক্তব্য, “সীমান্তের ও পারে মুহাম্মদ ইউনুসের পুলিশের সঙ্গে এপারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুলিশের কোনও তফাত নেই। দু’পক্ষই অন্ধভাবে তাদের প্রভুদের সেবা করছে।”

দীপু হত্যায় দফায় দফায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ দেখিয়েছে বিজেপি সহ হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি। শুক্রবার ডেপুটি হাইকমিশন কার্যালয়ের সামনে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। মাটিতে পোঁতা ধাতব ব্যারিকেড বসিয়ে গোটা এলাকা ঘিরে ফেলা হয়, কার্যত দুর্গে পরিণত করা হয় ওই অঞ্চলকে, যাতে কোনও বিক্ষোভকারী বাংলাদেশের সার্বভৌম কূটনৈতিক চত্বরে পৌঁছতে না পারেন। বৈঠকের পর শুভেন্দু অধিকারী আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, হামলা অব্যাহত থাকলে তিনি আরও বড় শক্তি নিয়ে ফিরে আসবেন। তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকশো সন্ন্যাসীর উপস্থিতিতে তিনি বলেন, “গঙ্গাসাগর মেলার পথে সন্ন্যাসীরা বাবুঘাটে শিবির করবেন। আগামী বছরের শুরুতে গঙ্গাসাগরের পাঁচ লক্ষ হিন্দু তীর্থযাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আমি আবার আসব এবং হাইকমিশনের দিকে আমাদের অভিযানে এই সব ব্যারিকেড উপড়ে ফেলব।”

হিংসার বাংলাদেশ-সংখ্যালঘুদের টার্গেট

বাংলাদেশে ১৮ ডিসেম্বর থেকে ব্যাপক হিংসা ছড়িয়ে পড়েছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা এবং আসন্ন সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী ওসমান হাদির হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ এবং সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি, একাধিক সাংস্কৃতিক স্থাপনায় ভাঙচুর ও সংবাদমাধ্যমের একটি অংশকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এই হিংসার জেরে বাংলাদেশে অন্তত দুই জন হিন্দু যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ। এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর লুটপাট ও আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। ময়মনসিংহ জেলায় ১৮ ডিসেম্বর ২৭ বছরের পোশাক কারখানার কর্মী দীপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, হত্যার পর তাঁর দেহ একটি গাছে ঝুলিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

এরপর ২৪ ডিসেম্বর, রাজবাড়ি জেলায় ২৯ বছরের অমৃত মণ্ডলকে স্থানীয় বাসিন্দারা পিটিয়ে হত্যা করে বলে অভিযোগ ওঠে। তবে এই ঘটনায় বাংলাদেশের প্রশাসন দাবি করেছে, অমৃত মণ্ডল একজন তালিকাভুক্ত অপরাধী ছিলেন। চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যে তিনি ওই এলাকায় প্রবেশ করেছিলেন এবং সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। ঘটনাগুলি ঘিরে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, বিশেষ করে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রশ্নে।

‘অবিরাম হামলা’ উদ্বেগের: ভারত

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর চলতে থাকা ‘অবিরাম হামলা’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত। একইসঙ্গে নয়াদিল্লি জানিয়েছে, প্রতিবেশী দেশে আসন্ন সংসদীয় নির্বাচন অবশ্যই মুক্ত, অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়েও সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে নয়াদিল্লি। বিদেশমন্ত্রক বলেছে, এই ঘটনাটিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার প্রেক্ষাপটে দেখা উচিত।

শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) সাপ্তাহিক সাংবাদিক বৈঠকে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, বাংলাদেশে সম্প্রতি হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাস খুন হওয়ার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে ভারত। বিদেশমন্ত্রকের মুখপাত্র বলেন, “বাংলাদেশে হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ-সহ সংখ্যালঘুদের উপর অবিরাম হামলা গভীর উদ্বেগের বিষয়। সাম্প্রতিক হিন্দু যুবক হত্যাকাণ্ডের আমরা নিন্দা জানাচ্ছি এবং আশা করছি, অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।” তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে চলমান পরিস্থিতির উপর ভারত নিবিড় নজর রাখছে।

বিদেশ মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ২,৯০০-রও বেশি হিংসাত্মক ঘটনার নথি স্বাধীন সূত্রে উঠে এসেছে। জয়সওয়াল স্পষ্ট করে বলেন, “বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর হিংসার ঘটনাগুলিকে সংবাদমাধ্যমের অতিরঞ্জন বলে উড়িয়ে দেওয়া বা শুধুমাত্র রাজনৈতিক হিংসা হিসেবে খাটো করে দেখা যায় না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!