ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি ও ধর্মীয় জগতের সমীকরণ এক নতুন মোড় নিল। প্রয়াগরাজের মাঘ মেলায় প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতের পর বারাণসীতে নিজের মঠে ফিরেই সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন স্বামী অভিমুক্তেশ্বরানন্দ সরস্বতী। গত ৩০ জানুয়ারি তিনি বিজেপি সরকারকে ৪০ দিনের চরম হুঁশিয়ারি (ultimatum) দিয়ে দাবি করেছেন, ‘গৌ-মাতা’কে ‘রাজ্য মাতা’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে এবং গো-মাংস রপ্তানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায়, আগামী ১১ মার্চ লখনউতে সাধু-সন্তদের সমাবেশ ডেকে মুখ্যমন্ত্রীকে ‘ছদ্ম হিন্দু’ বলে ঘোষণা করার হুমকি দিয়েছেন তিনি।
সম্প্রতি মৌনী অমাবস্যার পুণ্য লগ্নে প্রয়াগরাজের ত্রিবেণী সঙ্গমে তাঁকে রাজকীয় স্নান থেকে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে। এরপরই শুরু হয় ১১ দিনের দীর্ঘ অবস্থান বিক্ষোভ। সেই অধ্যায় আপাতত স্থগিত রেখে বারাণসীতে ফিরে নিজের অবস্থান আরও কঠোর করেছেন এই ধর্মগুরু।
মুখ্যমন্ত্রীকে ‘হিন্দুত্বের প্রমাণ’ দেওয়ার চ্যালেঞ্জ
বারাণসীর শ্রী বিদ্যা মঠে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে স্বামী অভিমুক্তেশ্বরানন্দ বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী আমার পদ এবং ঐতিহ্য নিয়ে প্রমাণ চেয়েছিলেন। সত্যের কোনো ভয় নেই, তাই আমরা তা দিয়েছি। কিন্তু এবার মুখ্যমন্ত্রীর পালা তিনি যে প্রকৃত হিন্দু, তার প্রমাণ দেওয়ার।” তিনি সাফ জানান, হিন্দু হওয়া মানে কেবল গেরুয়া পোশাক বা ভাষণ নয়, বরং গো-সেবা এবং ধর্মের সুরক্ষা। তাঁর দাবি দুটি- গরুকে উত্তরপ্রদেশের ‘রাজ্য মাতা’ (State Mother) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। উত্তরপ্রদেশ থেকে সব ধরনের গো-মাংস বা সমগোত্রীয় পশুর মাংস রপ্তানি বন্ধ করা।
তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ভারতের মোট মাংস রপ্তানির ৪০ শতাংশেরও বেশি আসে উত্তরপ্রদেশ থেকে। মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্য যদি দেশি গরুকে ‘রাজ্য মাতা’র মর্যাদা দিতে পারে, তবে উত্তরপ্রদেশ কেন পিছিয়ে থাকবে—এই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
‘শঙ্করাচার্য’ পদ নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক দড়ি টানাটানি
মাঘ মেলা চলাকালীন প্রয়াগরাজ মেলা কর্তৃপক্ষ স্বামী অভিমুক্তেশ্বরানন্দকে একটি নোটিশ পাঠায়। সেখানে সুপ্রিম কোর্টের ২০২২ সালের একটি বিচারাধীন মামলার প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন করা হয়—কোন অধিকারে তিনি নিজের নামের আগে ‘শঙ্করাচার্য’ উপাধি ব্যবহার করছেন?
প্রশাসনের যুক্তি, জ্যোতির্মঠের শঙ্করাচার্য পদের উত্তরাধিকার নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা চলছে এবং আদালত পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই পদে কাউকে নতুন করে অভিষিক্ত করার ওপর স্থগিতাদেশ রয়েছে। এর পাল্টা জবাবে স্বামী অভিমুক্তেশ্বরানন্দের প্রতিনিধি যোগীরাজ সরকার বলেন, “স্বামী স্বরূপানন্দ সরস্বতী মহারাজের প্রয়াণের পর তাঁর উইল অনুযায়ী এই অভিষেক সম্পন্ন হয়েছে। জ্যোতিষ পিঠের শূন্যতা দীর্ঘক্ষণ বজায় রাখা শাস্ত্রসম্মত নয়।” তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, বিজেপি সরকার আসলে ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে এবং বিরোধী শিবিরের সঙ্গে তাঁর মেলামেশার কারণেই তাঁকে হেনস্থা করা হচ্ছে।
ছাত্র রাজনীতি থেকে সন্ন্যাস
৫৬ বছর বয়সী এই সন্ন্যাসীর জন্ম উত্তরপ্রদেশের প্রতাপগড় জেলার ব্রাহ্মণপুর গ্রামে। সন্ন্যাস গ্রহণের আগে তাঁর নাম ছিল উমাশঙ্কর পাণ্ডে। তাঁর শিক্ষা ও রাজনৈতিক জীবনের শুরু বারাণসীর সম্পূর্ণানন্দ সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বর্তমানে বিজেপির ঘোর বিরোধী হিসেবে পরিচিত এই ধর্মগুরু ছাত্রজীবনে আরএসএস-এর ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (ABVP)-এর টিকিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০০ সালে তিনি নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচর্য দীক্ষা নিয়ে ‘আনন্দ স্বরূপ’ নাম ধারণ করেন। এরপর ২০০৩ সালে স্বামী স্বরূপানন্দ সরস্বতী মহারাজের কাছে সন্ন্যাস দীক্ষা নিয়ে তিনি ‘স্বামী অভিমুক্তেশ্বরানন্দ সরস্বতী’ হিসেবে পরিচিত হন। ২০২২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর স্বামী স্বরূপানন্দের প্রয়াণের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে জ্যোতির্মঠের শঙ্করাচার্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
দল নির্বিশেষে সংঘাতের ইতিহাস
যদিও বর্তমানে তাঁকে ‘বিজেপি-বিরোধী’ বা ‘কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, কিন্তু স্বামী অভিমুক্তেশ্বরানন্দের লড়াইয়ের ইতিহাস বলছে তিনি কোনো বিশেষ দলের অনুগত নন।
বিএসপি জমানা: মায়াবতী সরকারের সময় বারাণসীর রানি ভবানী মন্দির ভাঙার প্রতিবাদে তিনি সরব হয়েছিলেন।
সপা জমানা: ২০১৫ সালে অখিলেশ যাদবের শাসনকালে বারাণসীতে গণেশ মূর্তি বিসর্জন নিয়ে পুলিশের লাঠিচার্জের শিকার হয়েছিলেন তিনি। সেই সময় পুলিশের সঙ্গে তাঁর অনুগামীদের রক্তাক্ত সংঘর্ষ হয়েছিল।
ইউপিএ জমানা: গঙ্গা নদীকে ‘জাতীয় নদী’ ঘোষণার দাবিতে ইউপিএ সরকারের বিরুদ্ধে ‘গঙ্গা সেবা অভিযান’ চালিয়েছিলেন তিনি। এমনকি হিন্দুধর্ম অবমাননার অভিযোগে তিনি রাহুল গান্ধীকে ‘বহিষ্কার’ করার কথাও বলেছিলেন।
যোগী সরকার (প্রথম পর্ব): কাশী বিশ্বনাথ করিডোর নির্মাণের সময় প্রাচীন মন্দির ও বিগ্রহ সরানোর প্রতিবাদে ‘মন্দির বাঁচাও আন্দোলন’ গড়ে তুলেছিলেন তিনি।
কেদারনাথের ‘স্বর্ণ কেলেঙ্কারি’ ও সাম্প্রতিক বিতর্ক
স্বামী অভিমুক্তেশ্বরানন্দ গত বছর শিরোনামে এসেছিলেন যখন তিনি দাবি করেন যে, উত্তরাখণ্ডের কেদারনাথ মন্দির থেকে ২২৮ কেজি সোনা ‘উধাও’ হয়ে গেছে। তিনি একে বড়সড় দুর্নীতি বা স্ক্যাম বলে অভিহিত করেন। এছাড়া ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অযোধ্যায় রাম মন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানেও তিনি যোগ দেননি। তাঁর যুক্তি ছিল, মন্দির নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার আগেই প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা শাস্ত্রসম্মত নয়।
চলতি বছরের শুরুতে প্রয়াগরাজের কুম্ভ ও মাঘ মেলা ঘিরেও প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর তিক্ততা চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। গত জানুয়ারি মাসে প্রয়াগরাজে যখন স্ট্যাম্পিডে (পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু) অন্তত ৩০ জনের প্রাণ যায়, তখন তিনি সরাসরি যোগী সরকারকে প্রশাসনের ব্যর্থতার জন্য দায়ী করেছিলেন।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া: কংগ্রেস ও সপা-র সমর্থন
স্বামী অভিমুক্তেশ্বরানন্দের এই প্রতিবাদকে হাতিয়ার করে আসরে নেমেছে বিরোধীরা। উত্তরপ্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অজয় রাই প্রয়াগরাজে গিয়ে তাঁর ধর্ণায় সংহতি জানান। কংগ্রেসের মিডিয়া সেলের চেয়ারম্যান পবন খেরা টিপ্পনী কেটে বলেন, “বিজেপি আগে মুসলিমদের বলত কাগজ দেখাতে, এখন একজন পরম পূজনীয় শঙ্করাচার্যকেও কাগজ দেখাতে বলছে।” সমাজবাদী পার্টি প্রধান অখিলেশ যাদবও ফোন করে তাঁকে সমর্থন জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, বিজেপি শিবিরের একাংশ তাঁকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে আক্রমণ করলেও উপ-মুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্য নমনীয় সুরে জানিয়েছেন, কোনো আধিকারিক যদি সাধুদের সঙ্গে অভব্য আচরণ করে থাকেন তবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ হরিয়ানার এক সভায় কারো নাম না করে বলেন, “কিছু ‘কালনেমী’ ধর্মের আড়ালে সনাতন ধর্মকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্র করছে।” স্বামী অভিমুক্তেশ্বরানন্দের ৪০ দিনের সময়সীমা শেষ হচ্ছে আগামী মার্চ মাসে। লখনউয়ের রাজপথে সাধুদের সেই প্রস্তাবিত জমায়েত শেষ পর্যন্ত কী মোড় নেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে দেশের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মহল।
