স্টাফ রিপোর্টার
জলঙ্গি ও ডোমকল: যাঁদের নাড়ি পোঁতা এই মাটিতেই, যাঁদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি মিশে আছে এদেশের ধুলিকণায়— আজ তাঁরাই কি না ‘বেনাগরিক’? নিজের দেশেই হঠাৎ পরবাসী হয়ে যাওয়ার এক চরম আতঙ্ক গ্রাস করেছে জলঙ্গির সাধারণ মানুষকে। ভোটার তালিকা থেকে নাম ছেঁটে ফেলার এই ‘ফর্ম-৭’ চক্রান্তে এখন বিপন্ন কয়েকশ মানুষের নাগরিক পরিচয়।
মুর্শিদাবাদ জেলার সীমান্তবর্তী জলঙ্গি বিধানসভা এলাকায় হঠাৎ করেই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ফরিদপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কলিকাহারা গ্রামে অন্তত ৭০ জনের বেশি বৈধ ভোটারের নাম মুছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশনের কাছে ‘ফর্ম-৭’ জমা দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার জেরে এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। নিজেদের জন্মভূমিতে ‘বেনাগরিক’ তকমা পাওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন বহু মানুষ। অভিযোগ, ভোটারদের অজান্তেই তাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার এক গভীর চক্রান্ত চলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জলঙ্গি বিধানসভার ১৯৩ নম্বর বুথের বহু ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে একাধিক ‘ফর্ম-৭’ জমা দেওয়া হয়েছে। সাধারণত কোনো ভোটারের মৃত্যু হলে, স্থায়ীভাবে এলাকা ত্যাগ করলে বা নামের পুনরাবৃত্তি হলে এই ফর্ম ব্যবহার করে নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করা হয়। কিন্তু কলিকাহারার বাসিন্দাদের অভিযোগ, তাদের কেউই মৃত নন বা এলাকা ছাড়েননি—বরং তারা বহু বছর ধরে একই স্থানে বসবাস করছেন এবং নিয়মিত ভোট দিয়ে আসছেন। বাসিন্দাদের দাবি, আবেদনপত্রে বহু জীবিত ব্যক্তিকে ‘মৃত’ দেখানো হয়েছে এবং কয়েকজনের নামের পাশে ‘নট ইন্ডিয়ান সিটিজেন’ লেখা হয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামের বাসিন্দা মুহাম্মদ এনামুল হক ‘ডেইলি ডোমকল’-কে বলেন, “আমরা নাকি ভারতীয় নাগরিক নই বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অথচ আমাদের পূর্বপুরুষরা এখানেই জন্মেছেন, এখানেই মারা গেছেন। আমাদের সব বৈধ নথি রয়েছে। বহু বছর ধরে ভোট দিয়ে আসছি। হঠাৎ করে আমাদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠল কীভাবে?”

একই অভিযোগ করেছেন কাজী রুহুল আমিন। তাঁর কথায়, “আমার ও আমার স্ত্রীর নামের পাশে ‘নট ইন্ডিয়ান সিটিজেন’ লেখা হয়েছে। আমার বৌদি ও ভাইঝির নামেও একই কথা লেখা। এটা কীভাবে সম্ভব? আমরা তো এখানকারই বাসিন্দা।” আরেক বাসিন্দা সাগরা বিবি জানান, তাঁকে জীবিত থাকা সত্ত্বেও মৃত দেখিয়ে ফর্ম-৭ জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি নিজের হাতে ভোট দিয়েছি এত বছর। এখন শুনছি আমি নাকি মৃত! এটা আমাদের অস্তিত্বের ওপর আঘাত।”
ঘটনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল আবেদনকারীর পরিচয়। অভিযোগ, কলিকাহারা গ্রামের প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে রানিনগর থানার মোহনগঞ্জ এলাকার এক ব্যক্তি—বিজয় ঘোষ—এই ফর্ম-৭ জমা দিয়েছেন। তিনি বিজেপির মণ্ডল কমিটির সাধারণ সম্পাদক বলে দাবি গ্রামবাসীদের। গ্রামের মানুষের প্রশ্ন, যিনি ১৯৩ নম্বর বুথের বাসিন্দা নন এবং অন্য বুথের ভোটার, তিনি কীভাবে অন্য বুথের মানুষের নাম কাটার আবেদন করলেন? তাদের অভিযোগ, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং পরিকল্পিতভাবে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে এই কাজ করা হয়েছে। কাজী রুমা কুন্তম ‘ডেইলি ডোমকল’-কে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমি এই দেশের বৈধ নাগরিক। আমার ভোটার তালিকায় কোনো ভুল নেই। এসআইআর প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন থেকেও কোনো নোটিশ পাইনি। অথচ অন্য বুথের একজন ব্যক্তি আমার নাম বাদ দিতে আবেদন করে দিলেন! এটা কীভাবে সম্ভব? আমরা সংখ্যালঘু বলেই এই চক্রান্ত করা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।”
যদিও অভিযুক্ত বিজয় ঘোষ সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, “আমি কোনো ফর্ম-৭ জমা দিইনি। ওই এলাকাটাই আমি চিনি না। কেউ হয়তো আমার পরিচয় বা নথি জালিয়াতি করে এই কাজ করেছে।”

এদিকে ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর কলিকাহারার বাসিন্দারা একত্রিত হয়ে জলঙ্গি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং তদন্ত শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তাদের অজান্তে ফর্ম জমা দেওয়া হয়েছে। ফলে ভোটার তালিকার নিরাপত্তা ও যাচাই প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় ভোটাধিকার অন্যতম মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার। সেই অধিকারের ওপর এভাবে প্রশ্ন উঠলে তা শুধু একটি গ্রাম বা জেলার বিষয় থাকে না—বরং বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আস্থাকেই নড়িয়ে দেয়। ডোমকলের মানবাধিকার কর্মী মতিউর রহমান জানান, সীমান্তবর্তী এলাকায় নাগরিকত্ব ও ভোটার পরিচয় নিয়ে সংবেদনশীলতা বেশি থাকে। ফলে এ ধরনের অভিযোগ দ্রুত সামাজিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। তাঁর কথায়, কলিকাহারার ভোটার তালিকা বিতর্ক জলঙ্গিতে যে আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে, তা স্পষ্ট করে দেয়—ভোটাধিকার শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, এটি মানুষের পরিচয় ও মর্যাদার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নিজেদের বৈধ নাগরিকত্ব প্রমাণে বাধ্য হওয়ার ভয় গ্রামবাসীদের মনে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। মতিউর রহমান আরও বলেন, “নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা এবং সাধারণ মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। কারণ গণতন্ত্রের শক্তি নির্ভর করে ভোটারের ওপর, আর সেই ভোটারের পরিচয় যদি প্রশ্নের মুখে পড়ে, তবে তা পুরো ব্যবস্থার জন্যই উদ্বেগজনক।”
জলঙ্গির তৃণমূল বিধায়ক আব্দুর রাজ্জাক মণ্ডল বলেন, “এ ধরনের ঘটনা প্রতিহিংসা ও বিভাজনের জন্ম দেয়। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হবে।”
এই ঘটনায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে— কীভাবে অন্য বুথের একজন ব্যক্তি বহু ভোটারের নাম কাটার আবেদন করলেন? কীভাবে এত বিপুল সংখ্যক আবেদন একসঙ্গে জমা পড়ল, অথচ সংশ্লিষ্ট ভোটাররা তা জানতেই পারলেন না? নির্বাচনী নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আগে যাচাই, নোটিশ ও শুনানির প্রক্রিয়া থাকে। ১৯৩ বুথের বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও) সামিউল ইসলাম ‘ডেইলি ডোমকল’-কে বলেছেন, তিনি এইআরও (AERO) মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক ফর্ম-৭ জমা পড়ার বিষয়টি জানতে পারেন। তাঁকে যেভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা তিনি পালন করেছেন। বিএলওর কথায়, “আমি সশরীরে প্রত্যেক ভোটারের বাড়ি গিয়েছি এবং সবটা খতিয়ে দেখেছি। তারপর রিপোর্ট এইআরও (AERO) কে জমা করেছি।”
ঘটনার পর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জলঙ্গির সহকারী নির্বাচন আধিকারিক (AERO) সোমনাথ মুখোপাধ্যায় জানান, “অভিযোগ আমাদের নজরে এসেছে। যাঁদের নামে আপত্তি জানানো হয়েছে, তাঁদের নথিপত্র যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কেউ ফর্ম জমা দিলেই নাম বাদ দেওয়া হয় না—সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বক্তব্য জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়।”
বর্তমানে কলিকাহারা গ্রামে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ। বহু মানুষ আশঙ্কা করছেন, যদি নাম কাটা যায় তবে তারা ভোটাধিকার হারাবেন—এমনকি ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব নিয়েও সমস্যায় পড়তে পারেন। এক বাসিন্দার কথায়, “ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা মানে শুধু ভোট দিতে না পারা নয়—এটা আমাদের নাগরিক পরিচয়ের ওপর আঘাত। আমরা নিজেদের দেশেই পরবাসী হয়ে যাব।”
ডোমকলের মহকুমা শাসক তথা নির্বাচন রেজিস্ট্রেশন অফিসার (ERO) শুভঙ্কর বালা ‘ডেইলি ডোমকল’-কে বলেন, “বিষয়টি আমরা দেখছি। নিয়ম অনুযায়ী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। আইন অনুযায়ী যা ব্যবস্থা নেওয়ার, তা-ই নেওয়া হবে।”
জলঙ্গির কলিকাহারা গ্রামে যা ঘটছে, তা কেবল একটি গ্রামের ঘটনা নয়—এটি ভোটাধিকার, নাগরিক পরিচয় ও গণতান্ত্রিক আস্থার প্রতি প্রশ্ন। তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে অভিযোগের সত্যতা এবং কার বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ততদিন পর্যন্ত আতঙ্ক আর অপেক্ষার মধ্যেই দিন কাটবে জলঙ্গির বহু মানুষের।
