নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: ডোমকল ব্লকের তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েতকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের আবহ তৈরি হয়েছে। শুক্রবার ৮ নম্বর রায়পুর, জুড়ানপুর এবং ১ নম্বর ধূলাউড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানদের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব এনে ব্লক প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনাস্থা পত্র জমা দিয়েছেন বিরোধী সদস্যরা। ঘটনাকে কেন্দ্র করে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে।
বাম ও কংগ্রেসের দাবি, সংশ্লিষ্ট তিনটি পঞ্চায়েতে বর্তমান প্রধানদের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ভেঙে পড়েছে এবং নির্বাচিত সদস্যদের মতামত ও এলাকার উন্নয়নমূলক চাহিদা উপেক্ষিত হচ্ছে। অনাস্থা পত্রে তারা স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, তারা পঞ্চায়েত প্রধানদের প্রতি আস্থা হারিয়েছেন এবং পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত আইন অনুযায়ী প্রধানদের অপসারণের দাবি জানাচ্ছেন। বিরোধী সদস্যদের বক্তব্য, “মানুষের সেবা ও উন্নয়নের জন্য সাধারণ মানুষ আমাদের ভোট দিয়ে পঞ্চায়েত সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। কিন্তু আমরা এলাকার মানুষের কোনও কাজ করতে পারছি না। শাসকদলের প্রধান নিজের ইচ্ছেমতো পঞ্চায়েত চালাচ্ছেন। নির্বাচিত বিরোধী সদস্যদের গুরুত্ব দেওয়া হয় না, তাদের এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজও হয় না।” বিরোধী সদস্যরা সাফ জানিয়েছেন, তারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে নয়, এলাকার উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার স্বার্থে এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। তাদের দাবি, “আমরা প্রধানের বিরুদ্ধে নয়, দুর্নীতি ও একতরফা পঞ্চায়েত পরিচালনার বিরুদ্ধে লড়ছি।”
রায়পুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বাম সদস্য হায়দার মণ্ডল অভিযোগ করে বলেন, “পঞ্চায়েত গ্রামীণ এলাকার উন্নয়নের জন্য। কিন্তু এলাকায় উন্নয়ন না হলেও প্রধানের ব্যক্তিগত উন্নয়ন হয়েছে। অধিকাংশ কাজেই দুর্নীতি হচ্ছে। একটি রাস্তা তৈরির জন্য যে টাকা বরাদ্দ করা হয়, তার অর্ধেক কাজে লাগানো হয়, বাকি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এভাবে পঞ্চায়েত চলতে পারে না।” এদিকে জুড়ানপুর ও ধূলাউড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের বিরোধী সদস্যদের অভিযোগও প্রায় একই সুরে। তাদের দাবি, পঞ্চায়েত পরিচালনায় স্বচ্ছতার অভাব, প্রকল্প বণ্টনে পক্ষপাতিত্ব এবং বিরোধী সদস্যদের মতামতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করার কারণে তারা দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তুষ্ট ছিলেন। পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠায় শেষ পর্যন্ত অনাস্থা প্রস্তাব আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কংগ্রেসের এক সদস্যের সাফ কথা, “দুর্নীতিগ্রস্ত প্রধানকে আমরা চাই না। পঞ্চায়েত মানুষের জন্য, কোনও ব্যক্তির জন্য নয়।”
অন্যদিকে, শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধীদের সমস্ত অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের বক্তব্য, রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সুফল এলাকায় পৌঁছনোর ফলে বিরোধীরা জনসমর্থন হারাচ্ছে। সেই কারণেই রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে তারা এই ধরনের অভিযোগ তুলে পরিবেশ উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছে। তৃণমূলের ব্লক সভাপতি হাজিকুল ইসলাম বলেন, “মা-মাটি-মানুষ সরকারের উন্নয়নের ফলে এলাকায় বিরোধীরা অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। তাই তারা ভিত্তিহীন অভিযোগ করছে। যদি কোনও কাজে দুর্নীতি হয়ে থাকে, তাহলে এতদিন অভিযোগ করা হয়নি কেন? এখন হঠাৎ করে প্রধানকে অপসারণের দাবি কেন উঠছে? তাহলে কি বিরোধীরা লাইমলাইটে আসতে চাইছে?” তবে তৃণমূল নেতৃত্ব একই সঙ্গে জানিয়েছে, বিরোধীরা অনাস্থা পত্র জমা দিয়েছে—প্রশাসন আইন অনুযায়ী তার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে এবং তৃণমূল সেই প্রক্রিয়াকে সম্মান করে।
ব্লক প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত আইন অনুযায়ী অনাস্থা প্রস্তাবের নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। প্রস্তাব বৈধ কিনা এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্যের সমর্থন রয়েছে কিনা, তা যাচাই করা হবে। সমস্ত বিধি মেনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনাস্থা সভা ডাকা হবে। সেই সভায় উপস্থিত সদস্যদের ভোটাভুটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েত প্রধানদের পদে থাকার বা অপসারিত হওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ডোমকল ব্লক ঐতিহ্যগতভাবে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে পরিচিত। পঞ্চায়েত স্তরে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রায়শই অল্প ব্যবধানে নির্ধারিত হয়। ফলে কয়েকজন সদস্যের অবস্থান পরিবর্তন বা অসন্তোষ প্রকাশই ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিতে পারে। তিনটি পঞ্চায়েতে একসঙ্গে অনাস্থা প্রস্তাব আনা সেই রাজনৈতিক অস্থিরতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। কেউ কেউ মনে করছেন, অনাস্থা প্রস্তাবের ফলে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের কাজের গতি আরও শ্লথ হতে পারে। আবার অন্য অংশের মতে, যদি সত্যিই কোনও অনিয়ম বা পক্ষপাতিত্ব থেকে থাকে, তাহলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তার সমাধান হওয়াই উচিত।
সব মিলিয়ে, ডোমকল ব্লকের তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েতে প্রধানদের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব জমা পড়ায় স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন প্রশাসনিক বিধি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ ও অনাস্থা সভার ফলাফলের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ।
