ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার নিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন থেকে ফাঁস হওয়া এক তথ্য বলছে, যদি আরও ১০ দিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালিয়ে যায়, তবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরোধক অস্ত্রের মজুত বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের ভাণ্ডার “অসীম” এবং এসব মজুত দিয়েই “চিরকাল যুদ্ধ চালানো সম্ভব”। তবু সামরিক বিশ্লেষক ও সরকারি সূত্রের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন ছবি।
হামলার সূচনা ও দ্রুত উত্তেজনা বৃদ্ধি
ক’দিন আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, ইরানের সঙ্গে চলমান পারমাণবিক আলোচনায় তিনি সন্তুষ্ট নন। এর মাত্র তিন ঘণ্টা পরই তিনি সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। ওই অভিযানে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ নিহত হন বলে দাবি মার্কিন সূত্রের। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা এবং একাধিক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা রয়েছেন। এই হামলার পরপরই ইরান পাল্টা জবাব দেয়। বাহরাইন, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরাকে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় তেহরান। এতে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে নতুন করে যুদ্ধের মেঘ ঘনিয়ে ওঠে।
অস্ত্রভাণ্ডার নিয়ে পেন্টাগনের সতর্কবার্তা
সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডার চাপে পড়তে পারে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে পেন্টাগন। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পকে জানানো হয়েছে যে, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে গোলাবারুদ পুনরায় উৎপাদন ও মজুত করতে বিপুল ব্যয় হবে এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অচল হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। কিন্তু মঙ্গলবার নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, “যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত—বিশেষ করে মাঝারি ও উচ্চমানের অস্ত্র—এর আগে কখনও এত বেশি ছিল না। আমাদের কাছে প্রায় সীমাহীন সরবরাহ রয়েছে। এই মজুত দিয়েই ‘চিরকাল’ যুদ্ধ করা সম্ভব।” এর আগে সোমবার তিনি বলেছিলেন, ইরানে হামলা “চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ” চলতে পারে। পরে ইঙ্গিত দেন, সময়সীমা তারও বেশি হতে পারে।
কোন অস্ত্র ফুরিয়ে যেতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে প্রতিরোধমূলক ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রগুলো। ফেব্রুয়ারিতে এক প্রতিবেদন জানায়, পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তারা এবং জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন যে, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। কেইন বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদের ঘাটতি ইরানের পাল্টা হামলা নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল ও ইউক্রেনকে দীর্ঘদিন সামরিক সহায়তা দেওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত—বিশেষত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ—আগেই কমে এসেছে।
THAAD ও SM-3: চাপে প্রতিরক্ষা ঢাল
গত বছরের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র তার THAAD (Terminal High Altitude Area Defense) ব্যবস্থার ২৫ শতাংশ ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছিল। প্রায় ১৫০টি THAAD ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইরানের নিক্ষেপ করা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়। এতে স্পষ্ট হয়, উচ্চপ্রযুক্তির এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত খরচ হয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের উন্নতমানের নির্ভুল অস্ত্র ও প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র—বিশেষ করে THAAD ও জাহাজ থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য স্ট্যান্ডার্ড মিসাইল-৩ (SM-3)—এর মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যেতে পারে।
SM-3 একটি উন্নত অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা সমুদ্রভিত্তিক যুদ্ধজাহাজ থেকে নিক্ষেপ করা হয়। কিন্তু উৎপাদনের ধীরগতির কারণে এর মজুত ইতোমধ্যেই কম। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযান এবং আগের ইরান সংঘাতে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
JDAM: ‘স্মার্ট’ বোমার ঘাটতির আশঙ্কা
সবচেয়ে প্রভাবিত হতে পারে JDAM বা Joint Direct Attack Munitions। এগুলো আসলে জিপিএস-নিয়ন্ত্রিত কিট, যা সাধারণ বোমাকে অত্যন্ত নিখুঁত ‘স্মার্ট’ অস্ত্রে রূপান্তর করে। নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে সুনির্দিষ্ট আঘাত হানতে এগুলো অত্যন্ত কার্যকর। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উন্নত প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক অস্ত্রব্যবস্থাগুলো মূলত রাশিয়া, চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো শক্তিধর দেশের স্বল্পমেয়াদি ও তীব্র হামলা মোকাবিলার জন্য তৈরি। কিন্তু এখন যে ধরনের দীর্ঘস্থায়ী, কম খরচের রকেট ও ড্রোন হামলা চলছে, তা মোকাবিলায় এসব ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
ইরানের উৎপাদন ক্ষমতা বনাম মার্কিন প্রতিরক্ষা
সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। রুবিওর ভাষায়, “ইরান মাসে ১০০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। সেখানে আমরা ও আমাদের অংশীদাররা মাসে মাত্র ছয় বা সাতটি প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারি।” এই বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ৭৭৯ মিলিয়ন ডলার ব্যয়
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানে হামলার প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৭৭৯ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৬,৯০০ কোটি টাকা) ব্যয় করেছে। এতে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, বিমান অভিযান এবং নৌ-অভিযানের খরচ। নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, একটি বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ পরিচালনায় দৈনিক প্রায় ৬.৫ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়।
USS Gerald R Ford: যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে
বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী -কে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তি প্রদর্শন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানে হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র দুটি বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন করে, যার একটি ছিল জেরাল্ড আর ফোর্ড। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল সামরিক সমাবেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে শক্ত বার্তা দিতে চেয়েছিল। তবে এর আর্থিক মূল্যও কম নয়। হামলার আগে বিমান পুনর্বিন্যাস, নৌযান মোতায়েন ও আঞ্চলিক সম্পদ সক্রিয়করণ—সব মিলিয়ে প্রায় ৬৩০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে বলে অনুমান।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ব্যয় ২১০ বিলিয়ন ডলার!
পেন ওয়ার্টন বাজেট মডেলের পরিচালক এবং বিশিষ্ট আর্থিক বিশ্লেষক কেন্ট স্মেটার্সের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায় ২১০ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১৮.৮৭ লক্ষ কোটি টাকা) ব্যয় করতে হতে পারে। এই বিপুল অঙ্ক মার্কিন অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে, বিশেষত এমন সময়ে যখন দেশটি আগেই উচ্চ ঋণ ও বাজেট ঘাটতির মুখে রয়েছে।
ইসরায়েলকে সহায়তা: ৩১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয়
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে হামলা চালায়, যাতে প্রায় ১,২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ২১.৭ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দিয়েছে। এছাড়া ইয়েমেন, ইরান ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে পরিচালিত অভিযানে ৯.৬৫ থেকে ১২.০৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, সব মিলিয়ে এই ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩১.৩৫ থেকে ৩৩.৭৭ বিলিয়ন ডলার।
কৌশলগত ও রাজনৈতিক প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখা, অন্যদিকে বিপুল ব্যয় সামাল দেওয়া। ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার ইঙ্গিত দিলেও, পেন্টাগনের সতর্কবার্তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের মূল্য শুধু আর্থিক নয়, কৌশলগতও। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। কারণ একই সময়ে ইউরোপে ইউক্রেন যুদ্ধ, এশিয়ায় চীনের উত্থান এবং উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা—সব মিলিয়ে একাধিক ফ্রন্টে প্রস্তুত থাকতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে।
সামনে কী?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সংঘাত কি সীমিত থাকবে, নাকি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে? যদি ট্রাম্প প্রশাসন হামলা আরও কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে চালিয়ে যায়, তবে অস্ত্রভাণ্ডারের ঘাটতি, আর্থিক চাপ এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। একদিকে প্রেসিডেন্টের দাবি, “অসীম” অস্ত্রভাণ্ডার; অন্যদিকে পেন্টাগনের সতর্কবার্তা—এই দ্বৈত বার্তা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
