TOP NEWS

মৃতের পরিচয় অজানা, দাহকর্মে নেই বাধা: ডোমকলের ‘মস্তরাম মহাশ্মশান’ অনিয়মের শেষ ঠিকানা!

(ডোমকলের ‘মস্তরাম মহাশ্মশান’। || Image: Daily Domkal)

নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: শ্মশান আছে, কিন্তু নেই কোনো রেজিস্টার খাতা। নেই কোনো অফিস বা স্থায়ী কর্মী। এমনকি শবদাহ করতে লাগে না কোনো ডেথ সার্টিফিকেট। মুর্শিদাবাদের ডোমকল ব্লকের ধুলাউড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার কাশিপুরে ‘মস্তরাম মহাশ্মশান’ নিয়ে এমনই এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। বছরের পর বছর ধরে কোনো রকম আইনি নথি বা তদারকি ছাড়াই সেখানে চলছে শেষকৃত্য, যা ঘিরে বড়সড় নিরাপত্তা ও আইনি প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

ডোমকলের কাশিপুরে খয়রামারি বিলের ধারেই রয়েছে ওই শ্মশান। শ্মশানের উল্টোদিকে রয়েছে মস্তরাম সাধুর আখড়া। রাস্তার ধারে বিলের পাড়ে হলেও শ্মশানে ঢুঁ মারেন না কেউই। শ্মশানে গিয়েও দেখা মেলে না কোনও কর্মী। নেই অফিসও। সেখানে কারও দেখা না মেলায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মাঝবয়সী ব্যক্তিকে ওই শ্মশান সমন্ধে জিজ্ঞাসা করতেই ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়। ওই ব্যক্তির কথায়, “”শ্মশানে কেউ থাকে না। ডেথ সার্টিফিকেটও দেখানো লাগে না। লোকজন আসে, চুপচাপ দেহ দাহ করে চলে যায়। এর থেকে আমি বেশি কিছু জানিনা।” অর্থাৎ, কোনো অঘটন বা অপরাধমূলক মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে তার প্রমাণ লোপাটের এটি এক আদর্শ জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি, একসময়ে পঞ্চায়েত সমিতির অর্থে ওই শ্মশানটি তৈরি হয়েছিল। পরে তা পঞ্চায়েতের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপরে পঞ্চায়েত অবশ্য ওই শ্মশান নিয়ে আর মাথা ঘামাইনি বলেই দাবি। স্থানীয়দের দাবি, শবদাহ করতে কোনও শংসাপত্রের প্রয়োজন হয় না। শ্মশানে কোনও কমিটির অস্তিত্বও নেই। বছর কয়েক আগে কমিটি গঠনের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে তার কোনও রূপ আজও দেখা যায়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় প্রতি সপ্তাহেই শবদাহ হয় ওই শ্মশানে। কিন্তু কোন দেহ কোথা থেকে আসছে, মৃত্যুর কারণ কী, ডেথ সার্টিফিকেট রয়েছে কি না-সেসব দেখার কেউ নেই। সবকিছুই চলে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। এমনকি কবে কাকে ওই শ্মশানে দাহ কর হচ্ছে তার কোনও রেকর্ডও থাকেনা বলে অভিযোগ। উল্লেখ্য, বছর কয়েক আগে নদিয়ার একটি ঘটনায় ডেথ সার্টিফিকেট ছাড়া গণধর্ষণের ঘটনায় মৃত এক নাবালিকার দেহ দাহ করা নিয়ে রাজ্যজুড়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সেই ঘটনার পর নজরদারিবিহীন শ্মশানগুলিতে কমিটি গঠন ও কড়া নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশ কার্যত কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, খয়রামারির এই শ্মশান তার জ্বলন্ত উদাহরণ বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা।

এক সময় পঞ্চায়েত সমিতির অর্থানুকূল্যে শ্মশানটি তৈরি হলেও, পরবর্তীতে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পঞ্চায়েতের হাতে যায়। কিন্তু তারপর থেকেই ডোমকলের এই শ্মশানটি কার্যত অভিভাবকহীন। ধুলাউড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান পিঞ্জুরা বিবির বক্তব্য এ বিষয়ে আরও বিস্ময়কর। তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন, “শ্মশানে কোনো কমিটি নেই, আমরা নজরদারিও করি না। এভাবেই বহুদিন ধরে চলে আসছে। আমি ওই শ্মশান সমন্ধে খুব বেশি বলতেও পারব না।” পঞ্চায়েত প্রধানের এমন দায়সারা মন্তব্যে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়েছে।

চিকিৎসক মহলের মতে, ডেথ সার্টিফিকেট ছাড়া শবদাহ করা স্পষ্টত বেআইনি। ডোমকল সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের চিকিৎসক বরুণ বিশ্বাস জানান, “শংসাপত্র ছাড়া দাহকাজ সম্পন্ন হলে ভবিষ্যতে কোনো তদন্তের প্রয়োজনে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।”

নদিয়ায় এক নাবালিকার দেহ শংসাপত্র ছাড়াই দাহ করা নিয়ে রাজ্যজুড়ে তোলপাড় হয়েছিল। সেই ঘটনার পর রাজ্য সরকার কড়া নির্দেশিকা জারি করলেও মস্তরাম শ্মশানের চিত্র বলছে অন্য কথা। প্রশ্ন উঠছে, জনমানবহীন বিলের ধারে এই ‘অনিয়ন্ত্রিত’ শ্মশান কি কোনো বড় অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠছে? প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চাইছে কাশিপুরের বাসিন্দারা। যদিও বিষয়টি সম্পর্কে ডোমকলের মহকুমা শাসক (SDO) শুভঙ্কর বালা জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!