ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: ইরানে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সর্বোচ্চ নেতা পরিবর্তনের পর দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ মুজতবা খামেনি জাতির উদ্দেশে তাঁর প্রথম বার্তা দিয়েছেন। এই বার্তায় তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন—ইরানের শহিদদের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়া হবে এবং সেই প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত এই বিষয়টি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকবে।
ইসলামিক বিপ্লবের নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর এই প্রথমবার তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানি জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দেন। সেখানে তিনি দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, যুদ্ধ, শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা, জনগণের ভূমিকা এবং আঞ্চলিক রাজনীতির নানা দিক তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার কৌশল এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূমিকা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন।
শহিদদের রক্তের প্রতিশোধের অঙ্গীকার
মুজতবা খামেনির ভাষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল প্রতিশোধের ঘোষণা। তিনি বলেন, ইরানের শহিদদের রক্ত কখনোই বিস্মৃত হবে না এবং তাদের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। তিনি বলেন, ইরান শুধুমাত্র দেশের সর্বোচ্চ নেতার শহিদ হওয়ার প্রতিশোধই নেবে না; বরং শত্রুর হাতে নিহত প্রতিটি ইরানি নাগরিকের জন্য পৃথক প্রতিশোধের নথি তৈরি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রতিশোধের কিছু অংশ বাস্তবায়িত হয়েছে, কিন্তু এটি এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। যতক্ষণ না পূর্ণ প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই বিষয়টি রাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার হয়ে থাকবে।
এই বক্তব্যে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব সংঘাত থেকে পিছু হটার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। বরং তারা এই সংঘাতকে জাতীয় মর্যাদা এবং প্রতিরোধের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরছে।
নতুন নেতার আবির্ভাব: কঠিন দায়িত্বের স্বীকারোক্তি
মুজতবা খামেনি তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই বলেন, তিনি এই দায়িত্ব গ্রহণকে অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করেন। কারণ, তিনি এমন একটি পদে বসেছেন যা আগে দখল করেছিলেন ইসলামিক বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা নেতা ইমাম খোমেনি এবং পরবর্তী দীর্ঘ সময় ধরে নেতৃত্ব দেওয়া আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি। তিনি বলেন, এই পদে বসা মানে এমন একজন ব্যক্তির উত্তরসূরি হওয়া, যিনি ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করেছেন এবং দেশের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হয়ে উঠেছিলেন। নতুন নেতা আরও জানান, তিনি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর পিতার শহিদ হওয়ার পর তাঁর দেহ দেখেছিলেন। তাঁর ভাষায়, সেই দৃশ্য ছিল এক অটল দৃঢ়তার প্রতীক। তিনি উল্লেখ করেন, শহিদ হওয়ার সময়ও তাঁর পিতার হাত মুষ্টিবদ্ধ ছিল—যা প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা করেন।
জনগণের ভূমিকার ওপর জোর
নিজের ভাষণে মুজতবা খামেনি বিশেষভাবে ইরানের জনগণের ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সংকটের সময় যখন দেশ কিছু সময়ের জন্য সর্বোচ্চ নেতা এবং সর্বাধিনায়কবিহীন ছিল, তখন ইরানি জনগণই দেশের নেতৃত্ব দিয়েছে এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে। তাঁর মতে, জনগণের সচেতনতা, সাহস এবং ঐক্যই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। তিনি বলেন, যদি জনগণের শক্তি সামনে না আসে, তাহলে রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে না।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন—যেখানে ধর্মীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে তুলে ধরা হয়।
কোরআনের আয়াত দিয়ে ভাষণের সূচনা
মুজতবা খামেনি তাঁর বক্তব্য শুরু করেন পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করে। সেই আয়াতে বলা হয়েছে—আল্লাহ কোনো নিদর্শন তুলে নিলে তার পরিবর্তে সমপর্যায়ের অথবা আরও উত্তম কিছু প্রদান করেন। এই আয়াত উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর অর্থ এই নয় যে তিনি তাঁর পিতার সমতুল্য বা তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। বরং এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, ইরানের জনগণই সেই শক্তি, যারা দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান
নতুন নেতা ইরানের জনগণকে ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যুদ্ধ বা সংকটের সময় জাতির বিভিন্ন অংশের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মতভেদ থাকলেও তা অতিক্রম করে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তাঁর মতে, জাতীয় ঐক্যই ইরানকে শক্তিশালী রাখবে এবং শত্রুদের পরিকল্পনা ব্যর্থ করবে।
কুদস দিবসের সমাবেশে অংশগ্রহণের আহ্বান
মুজতবা খামেনি বিশেষভাবে কুদস দিবসের সমাবেশে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। প্রতি বছর রমজান মাসের শেষ শুক্রবার ইরানে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কুদস দিবস পালন করা হয়, যা মূলত ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি প্রকাশের দিন। তিনি বলেন, এবারের কুদস দিবসের সমাবেশে শত্রুকে পরাজিত করার সংকল্পই প্রধান বার্তা হওয়া উচিত।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে কঠোর অবস্থান
মুজতবা খামেনির বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের অবস্থান। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখার কৌশল অব্যাহত থাকবে। হরমুজ প্রণালী বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ, যার মাধ্যমে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল পরিবহন করা হয়। এই প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। নতুন নেতার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
নতুন যুদ্ধক্ষেত্র খোলার সম্ভাবনা
মুজতবা খামেনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, প্রয়োজনে নতুন যুদ্ধক্ষেত্রও খোলা হতে পারে। তিনি জানান, এমন কিছু সম্ভাব্য ফ্রন্ট নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে যেখানে শত্রু তুলনামূলকভাবে দুর্বল। যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সেগুলো সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, ইরান ভবিষ্যতে সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে।
প্রতিরোধ ফ্রন্টের প্রশংসা
মুজতবা খামেনি তাঁর বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের তথাকথিত ‘প্রতিরোধ ফ্রন্ট’-এর ভূমিকাও প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, এই ফ্রন্টের দেশগুলো ইরানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি বিশেষভাবে ইয়েমেন, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এই গোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলবিরোধী আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের জন্য আশ্বাস
যুদ্ধের কারণে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের জন্যও তিনি কিছু প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, যারা আহত হয়েছেন তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হবে। যাদের বাড়ি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া শহিদদের পরিবারদের জন্য বিশেষ সহায়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
শত্রুর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ঘোষণা
মুজতবা খামেনি বলেন, যুদ্ধের কারণে ইরানের যে ক্ষতি হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ শত্রুর কাছ থেকেই আদায় করা হবে। তিনি বলেন, যদি শত্রুরা স্বেচ্ছায় ক্ষতিপূরণ না দেয়, তাহলে তাদের সম্পদ জব্দ করা হবে অথবা সমপরিমাণ ক্ষতি করা হবে। এই মন্তব্য ইরানের ভবিষ্যৎ নীতি সম্পর্কে একটি শক্ত বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর উদ্দেশে সতর্কবার্তা
নতুন নেতা প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতিও একটি বার্তা দেন।
তিনি বলেন, ইরান ১৫টি দেশের সঙ্গে স্থল বা সমুদ্র সীমান্ত ভাগ করে এবং তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। কিন্তু তিনি অভিযোগ করেন, কিছু দেশ শত্রু শক্তিকে তাদের ভূখণ্ডে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে দিয়েছে। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক সংঘাতে সেই ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও যদি এমন হয় তাহলে ইরান সেই ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে বাধ্য হবে।
বন্ধুত্বের বার্তা
কঠোর সতর্কতার পাশাপাশি তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ইরান কোনো ধরনের আঞ্চলিক আধিপত্য বা উপনিবেশ স্থাপন করতে চায় না। বরং পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।
শহিদ নেতার প্রতি শ্রদ্ধা
ভাষণের একটি অংশ তিনি তাঁর পিতা এবং সাবেক সর্বোচ্চ নেতার উদ্দেশে উৎসর্গ করেন। তিনি বলেন, তাঁর মৃত্যু জাতির হৃদয়ে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর পিতা সবসময় শহিদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহ সেই ইচ্ছা পূরণ করেছেন।
সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা
ভাষণের শেষে তিনি দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় নেতা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সাধারণ জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন শহরে যে বিশাল সমাবেশ হয়েছে তা ইরানের জনগণের সমর্থনের প্রমাণ।
সামনে কী?
মুজতবা খামেনির এই প্রথম বার্তা থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—
১. ইরান সংঘাত থেকে পিছু হটছে না।
২. প্রতিশোধ এবং প্রতিরোধের নীতি অব্যাহত থাকবে।
৩. আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরান আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।
৪. জনগণের ঐক্য এবং অংশগ্রহণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখা এবং নতুন যুদ্ধক্ষেত্র খোলার সম্ভাবনার কথা বলায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন—যা কূটনৈতিক দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি বলেই ইঙ্গিত দেয়।
