ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা বাজিয়ে সোমবার প্রথম দফার প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করল বিজেপি। ১৪৪ জনের এই তালিকায় সবথেকে বড় চমক নন্দীগ্রামের বিধায়ক তথা রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর নাম। গতবারের জয়ী কেন্দ্র নন্দীগ্রামের পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের খাসতালুক বলে পরিচিত দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর থেকেও শুভেন্দুকে প্রার্থী করে তৃণমূল সুপ্রিমোকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল গেরুয়া শিবির। মনে করা হচ্ছে, এবারের নির্বাচন হতে চলেছে মূলত ‘মমতা বনাম শুভেন্দু’র লড়াই।
রণকৌশলে ‘অধিকারী’ ফ্যাক্টর
দিল্লির সদর দপ্তর থেকে ঘোষিত এই তালিকায় স্পষ্ট, বিজেপি এবার সুপরিকল্পিতভাবে শুভেন্দু অধিকারীকে দলের ‘প্রিন্সিপাল ফিল্ড কমান্ডার’ বা প্রধান সেনাপতি হিসেবে তুলে ধরছে। বিশ্লেষকদের মতে, শুভেন্দুকে একই সঙ্গে দুটি হাই-প্রোফাইল কেন্দ্রে লড়াইয়ে নামানো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
নন্দীগ্রাম: ২০০৭-এর জমি আন্দোলন কেন্দ্রিক এই জনপদ তৃণমূল নেত্রীর উত্থানের ভিত্তিভূমি হলেও, ২০২১ সালে এখানেই তাঁকে ১৯০০-র সামান্য বেশি ভোটে পরাজিত করেছিলেন শুভেন্দু। সেই রাজনৈতিক গুরুত্ব বজায় রাখতেই তাঁকে ফের নন্দীগ্রামে রাখা হয়েছে।
ভবানীপুর: এটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের গড়। ২০২১-এর উপনির্বাচনে তিনি এখান থেকে ৫৮,০০০-এর বেশি ভোটে জিতেছিলেন। সেই দুর্গে থাবা বসাতে শুভেন্দুকে প্রার্থী করে বিজেপি এই বার্তাই দিতে চাইছে যে, তারা মুখ্যমন্ত্রীর ঘরের মাঠেই তাঁকে রুখে দিতে প্রস্তুত।
প্রার্থী ঘোষণার পর আত্মবিশ্বাসী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “আমি উভয় আসনেই জয়লাভ করব এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আবার পরাজিত করব।” রাজনৈতিক মহলের মতে, উপকূলীয় বাংলা এবং জঙ্গলমহলে শুভেন্দুর যে সাংগঠনিক দক্ষতা ও ব্যক্তিগত প্রভাব রয়েছে, তাকেই গোটা রাজ্যে ছড়িয়ে দিতে চাইছে বিজেপি।
পুরনো চাল ভাতে বাড়ে: অভিজ্ঞতায় আস্থা
প্রথম তালিকায় বিজেপি মূলত ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছে। দলের ৮১ জন বর্তমান বিধায়কের মধ্যে ৪১ জনকেই ফের টিকিট দেওয়া হয়েছে। আসানসোল দক্ষিণ থেকে অগ্নিমিত্রা পাল, শালতোড়া থেকে চন্দনা বাউরি এবং ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি থেকে শিখা চট্টোপাধ্যায়ের ওপর পুনরায় আস্থা রেখেছে দল। এছাড়া খড়গপুর সদর থেকে হেভিওয়েট নেতা দিলীপ ঘোষ এবং দক্ষিণ কলকাতার রাসবিহারী কেন্দ্র থেকে প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ স্বপন দাশগুপ্তকে প্রার্থী করা হয়েছে।
তারুণ্য ও পেশাদারিত্বের সংমিশ্রণ
বিজেপির এবারের প্রার্থী তালিকায় একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো সামাজিক বৈচিত্র্য এবং তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব। ৩৬ জন প্রার্থী রয়েছেন যাঁদের বয়স ৪০ বছরের নিচে। ৪১ থেকে ৫৫ বছর বয়সী প্রার্থীর সংখ্যা ৭২। ৫৬ থেকে ৭০ বছর বয়সীদের মধ্যে ৩২ জন এবং ৭০-এর বেশি বয়সের মাত্র ৪ জন প্রার্থী রয়েছেন। ১৪৪ জনের মধ্যে ৫৭ জন প্রার্থী বিভিন্ন সম্মানজনক পেশা থেকে এসেছেন। এর মধ্যে ২৩ জন শিক্ষক, যা পেশাজীবীদের মধ্যে বৃহত্তম গোষ্ঠী। এছাড়া আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রাক্তন সেনাকর্মী, সাংবাদিক এবং সাংস্কৃতিক জগতের ব্যক্তিত্বরা রয়েছেন। অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ এবং ময়না থেকে প্রাক্তন ক্রিকেটার অশোক ডিন্ডাকে পুনরায় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নৈহাটি কেন্দ্র থেকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিবারের সদস্য সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে প্রার্থী করে বাঙালি আবেগকে ছোঁয়ার চেষ্টা করেছে গেরুয়া দল। মহিলা প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে ১১টি আসনে নারী প্রার্থীদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
ভোটার তালিকা ও এসআইআর বিতর্ক
প্রার্থী তালিকা প্রকাশের সমান্তরালে রাজ্যে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) বা ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে রাজনৈতিক পারদ তুঙ্গে। বিশেষ করে ভবানীপুর ও নন্দীগ্রামের ভোটার সংখ্যায় বড়সড় রদবদল নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই কেন্দ্রে প্রায় ৪৭,০০০ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং ১৪,০০০ নাম বর্তমানে বিচারাধীন।
জমি আন্দোলনের এই পুণ্যভূমিতে প্রায় ১১,০০০ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বিজেপির দাবি, “ভুয়া ভোটার” সরানোর জন্য এই পদক্ষেপ জরুরি ছিল। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, এটি ভোটার তালিকায় কারচুপি করে নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার একটি চক্রান্ত।
তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক লড়াই
বিজেপির এই রণকৌশলকে অবশ্য বিশেষ গুরুত্ব দিতে নারাজ শাসক দল। তৃণমূলের এক শীর্ষ নেতা একে ‘রাজনৈতিক নাটক’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, “শুভেন্দুকে ভবানীপুরে দাঁড় করানো আসলে লোকদেখানো চমক ছাড়া আর কিছু নয়। বাংলার মানুষ জানেন মুখ্যমন্ত্রী তাঁর নিজের এলাকায় কতটা জনপ্রিয়।” তবে বিজেপি নেতৃত্ব পরিসংখ্যান তুলে ধরে পালটা দাবি করেছে। ২০১১ সালে মাত্র ৪ শতাংশ ভোট পাওয়া দল ২০২১ সালে ৩৮ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে উঠে এসেছে। তাদের মতে, এবারের নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ব্যক্তিগত ক্যারিশমা’র বিপরীতে শুভেন্দু অধিকারীর ‘মাঠের লড়াই’ তাদের ক্ষমতায় নিয়ে আসবে।
বিশ্লেষণ: তিন স্তম্ভের কৌশল
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিজেপির এই প্রথম তালিকা তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে:
১. ব্যক্তি বনাম ব্যক্তি: নির্বাচনকে নীতি বা উন্নয়নের চেয়ে ‘মমতা বনাম শুভেন্দু’র ব্যক্তিগত দ্বৈরথে রূপান্তরিত করা।
২. সাংগঠনিক সংহতি: বর্তমান বিধায়কদের টিকিট দিয়ে দলের ভেতরকার বিদ্রোহ দমানো এবং জেতা আসনগুলো সুরক্ষিত রাখা।
৩. সামাজিক বিস্তার: শিক্ষক, আইনজীবী ও বিশিষ্ট পেশাজীবীদের প্রার্থী করে মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত ভোটারদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো।
আগামী ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এখন দেখার বিষয়, ভবানীপুর ও নন্দীগ্রামের এই দ্বিমুখী লড়াই শেষ পর্যন্ত বাংলার তখত কার দখলে নিয়ে যায়।
