ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উত্তর কোরিয়া সাফ জানিয়ে দিল যে, তারা কোনও অবস্থাতেই তাদের পরমাণু অস্ত্র ত্যাগ করবে না। মঙ্গলবার উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সে দেশের সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উন দক্ষিণ কোরিয়াকে “সবচেয়ে প্রতিকূল রাষ্ট্র” (Most Hostile State) হিসেবে চিহ্নিত করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। একইসঙ্গে ইরান ও ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপকে “রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ” বলে আখ্যা দিয়েছেন তিনি।
পরমাণু অবস্থান: ‘অপরিবর্তনীয় পথ’
সোমবার দেশের আইনসভা ‘সুপ্রিম পিপলস অ্যাসেম্বলি’-তে নীতি নির্ধারণী ভাষণ দেওয়ার সময় কিম জং উন তাঁর আক্রমণাত্মক অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, “আমরা পরমাণু অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের মর্যাদাকে একটি অপরিবর্তনীয় পথ হিসেবে সুসংহত করব। শত্রু শক্তির বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম আরও জোরদার হবে।” তিনি আরও জানান, প্রজাতন্ত্রের সংবিধান অনুযায়ী আত্মরক্ষামূলক পরমাণু প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে (Nuclear Deterrent) আরও সম্প্রসারিত ও উন্নত করা হবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতি কঠোর মনোভাব
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিউং গত জুন মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিনাশর্তে আলোচনার একাধিক প্রস্তাব দিলেও পিয়ংইয়ং তা বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে। কিম জং উন তাঁর দক্ষিণ প্রতিবেশী সম্পর্কে বলেন, “আমরা দক্ষিণ কোরিয়াকে সবচেয়ে প্রতিকূল রাষ্ট্র হিসেবে মনোনীত করব এবং তাদের সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান ও উপেক্ষা করার মাধ্যমে মোকাবিলা করব।” তিনি সতর্ক করে দেন, উত্তর কোরিয়ার সার্বভৌমত্বে আঘাত লাগলে তার চরম মূল্য চোকাতে হবে।
বিশ্ব রাজনীতি ও নিরাপত্তা উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, আমেরিকা কর্তৃক ইরান ও ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক হামলা উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বকে আরও আতঙ্কিত করে তুলেছে। ‘কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশন’-এর সিনিয়র অ্যানালিস্ট হং মিন বলেন, “কিম জং উন আমেরিকার এই পদক্ষেপগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন এবং এটিই তাঁকে পরমাণু সক্ষমতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে অটল থাকতে উদ্বুদ্ধ করছে।” আমেরিকা বর্তমানে বেইজিংয়ের সাথে আলোচনার মাধ্যমে কিমের সাথে একটি সম্ভাব্য শীর্ষ সম্মেলনের চেষ্টা করলেও, কিম অভিযোগ করেছেন, ওয়াশিংটন রণকৌশলগত পারমাণবিক সম্পদ মোতায়েন করে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ভিত্তি নাড়িয়ে দিচ্ছে।
সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান
পারমাণবিক সক্ষমতার দিক থেকে উত্তর কোরিয়া এখন অনেকটাই এগিয়ে বলে মনে করা হচ্ছে। দেশটির হাতে বর্তমানে কয়েক ডজন পরমাণু ওয়ারহেড এবং সেগুলো উৎক্ষেপণের জন্য অত্যাধুনিক সলিড-ফুয়েল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল (ICBM) রয়েছে। ২০২৬ সালে উত্তর কোরিয়া তাদের মোট বাজেটের ১৫.৮ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করার পরিকল্পনা করেছে (২০২৫ সালে যা ছিল ১৫.৭ শতাংশ)। কিম শিল্প উৎপাদন ১.৫ গুণ বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। তিনি দাবি করেন যে, পরমাণু অস্ত্র ত্যাগ না করেও সমৃদ্ধি সম্ভব, যা তিনি গত পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন।
১৯৪৮ সালে দাদু কিম ইল সুং-এর প্রতিষ্ঠিত এই রাষ্ট্রের তৃতীয় প্রজন্মের শাসক হিসেবে কিম জং উন ২০১১ সাল থেকে ক্ষমতায় রয়েছেন। মঙ্গলবার প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, স্যুট পরিহিত কিমকে লাল গালিচায় আইনপ্রণেতারা দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাচ্ছেন। কিমের এই সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থান এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনার পারদ চড়িয়েছে।
