TOP NEWS

ইসলামপুরে বিদেশি কুল চাষে জালের ফাঁদে পাখিমৃত্যু: ‘অমানবিকতায়’ ক্ষোভ স্থানীয়দের

(জালে আটকে পড়ে পাখিদের মৃত্যুর। || নিজস্ব চিত্র।)

নিজস্ব সংবাদদাতা, ইসলামপুর: বিদেশি কুলের ফলন রক্ষায় কৃষিজমি জুড়ে নেট বা জাল টাঙানোর প্রবণতা বাড়ছে ইসলামপুরে। কিন্তু ফল রক্ষার এই ব্যবস্থা এখনই বড় পরিবেশগত প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অভিযোগ, কুল খেতে এসে সেই জালেই আটকে পড়ে মৃত্যু হচ্ছে বুলবুলি, শালিকসহ নানা প্রজাতির পাখির। বহু জমিতে নেটের ফাঁদে ঝুলন্ত মৃত পাখির দৃশ্য দেখে ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বন দফতর জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা যায়, ইসলামপুর থানার টেকারাইপুর বালুমাটি গ্রাম পঞ্চায়েতের শিশেপাড়া এলাকায় কুল চাষের জন্য প্রতিটি বাগানেই দেখা যাচ্ছে গোটা জমি জুড়ে নেট টাঙানো। কৃষকদের বক্তব্য, বিদেশি জাতের কুল অত্যন্ত মিষ্টি হওয়ায় পাখির আক্রমণ বেশি হয়; ফলে ফলন ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। তাই বাধ্য হয়েই তাঁরা নেট দিয়ে জমি ঘিরছেন। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, ওই নেট পাখির জন্য প্রাণঘাতী ফাঁদ হয়ে উঠেছে। কুল খেতে ঢুকে পাখিরা জালে জড়িয়ে যায়। মুক্ত হতে না পেরে দীর্ঘক্ষণ ঝুলতে ঝুলতেই তাদের মৃত্যু হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মৃতদেহ পচে গিয়ে নেটেই ঝুলে থাকতে দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “আমাদের এলাকায় প্রায় সব কুলবাগানেই নেট দেওয়া হয়েছে। একেকটা জমিতে ৫–৬টা করে পাখি মরে ঝুলছে। কোথাও আবার ডজনখানেক। খুব খারাপ লাগে।” আরও এক বাসিন্দা রুবেল হাসানের অভিযোগ, “পাখিরা তো বোঝে না জাল কী। ফল খেতে এসে আটকে যাচ্ছে। তারপর তাদের মৃত্যু হচ্ছে। এটা খুব অমানবিক। প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে হবে।”

অন্যদিকে কুলচাষিরা বলছেন, নেট ছাড়া উপায় নেই। এক চাষি জানান, “আমরা জানি পাখিরা আটকে পড়ে। কিন্তু নেট না দিলে পুরো ফল শেষ হয়ে যায়। বিদেশি কুলে খরচ অনেক। পাখির জন্য সব নষ্ট হলে ক্ষতি কে দেবে?” কৃষকদের মতে, পাখির আক্রমণে ৩০–৪০ শতাংশ পর্যন্ত ফলন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বাজারমূল্য ও বিনিয়োগ বাঁচাতে নেট ব্যবহার তাঁদের কাছে একমাত্র কার্যকর উপায়। আমরা চেষ্টা করি পাখি আটকে গেলে তাদের ছাড়িয়ে দেওয়ার। তবু কখনো আটকে যায়।

(ইসলামপুরে জাল বেধে কুলের চাষ। || নিজস্ব চিত্র।)

এভাবে নির্বিচারে নেট ব্যবহার করলে পাখির সংখ্যা দ্রুত কমে যেতে পারে। পাখিরা শুধু ফল খায় না, বরং পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে কৃষিরই ক্ষতি হতে পারে। পরিবেশপ্রেমীদের মতে, কৃষি নেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে নির্দিষ্ট মানদণ্ড আছে—যেমন বড় ছিদ্রের নেট, দৃশ্যমান রঙ, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি—যা এখানে মানা হচ্ছে না। তবে পাখি তাড়ানোর জন্য ভয় দেখানোর ফিতা, প্রতিফলক, শব্দযন্ত্র ইত্যাদি—ব্যবহার করা যেতে পারে। ফসল রক্ষা ও পাখি সংরক্ষণ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে।

কুলচাষ অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, পাখিমৃত্যুর এই দৃশ্য কৃষি ও পরিবেশের সংঘাতকে সামনে এনে দিয়েছে। একদিকে কৃষকের জীবিকা, অন্যদিকে জীববৈচিত্র্য—এই দ্বন্দ্বের সমাধান খুঁজতে প্রশাসনের পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে। স্থানীয় কেউ কেউ বলছেন—“ফল মানুষ খাবে, ঠিক আছে। কিন্তু পাখিরাও তো প্রকৃতির অংশ। তাদের এভাবে মরতে দেখলে মন কাঁদে।” এদিকে বন দফতর জানিয়েছে, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। টিম পাঠিয়ে পরিদর্শন করা হবে। বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইনের আওতায় পাখি মারা গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!