TOP NEWS

এসআইআর নিয়ে ষড়যন্ত্র! নাগরিকদের হয়রানি সহ্য করতে না পেরে পদত্যাগ কমিশনের এইআরও-র

নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: রাজ্যে চলমান স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়াকে ঘিরে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। “লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি” দেখিয়ে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এমনই অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেছেন এক সহকারী ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (AERO)। “লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি” বলতে পরিবারবৃত্তান্ত যাচাইকরণ-এর সময় যাদের পারিবারিক তথ্য অসঙ্গত দেখা গেছে, সেই ভোটারদের বোঝানো হয়।

বাগনান বিধানসভা কেন্দ্রের কমিশনের এক আধিকারিক (AERO) মৌসম সরকার অভিযোগ করেন, এই লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় অংশকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার “ষড়যন্ত্র” চলছে। বৃহস্পতিবার সংশ্লিষ্ট ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (ERO) অচিন্ত্য কুমার মণ্ডলের কাছে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। শুক্রবার রাতে ওই পদত্যাগপত্র গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন অচিন্ত্য কুমার। তিনি জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছেন।

মৌসম সরকার বাগনান ব্লক–II-এর ব্লক ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট দফতরের আধিকারিক। ওই ব্লকে লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি সংক্রান্ত শুনানি শুরু হওয়ার কথা ১৪ জানুয়ারি থেকে। শুধু ওই ব্লকেই এমন মামলার সংখ্যা প্রায় ২৪ হাজার। শুনানির আগেই AERO দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চান তিনি। পদত্যাগপত্রে মৌসম উল্লেখ করেন, “লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সিতে যে নামের বানানের ভুল পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলি ২০০২ সালের ভোটার তালিকাতেই ছিল। পরে সাধারণ নাগরিকেরা ইসি–র নিয়ম মেনে ফর্ম ৮ জমা দিয়ে সংশোধন করেছেন। তাই বানানে অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। একই কারণে বয়সেও ভুল দেখা যাচ্ছে।”

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, “একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, এই ধরনের লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সির কোনও যুক্তি নেই। উদ্দেশ্য হচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষ এবং প্রান্তিক সম্প্রদায়ের ভোট বাতিল করা। তাদের কাছে ১২টি প্রয়োজনীয় নথি নেই। ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, রেশন কার্ড আছে, কিন্তু সেগুলো গ্রহণ করা হচ্ছে না। এতে একটি বিশেষ শ্রেণি এবং বহু প্রান্তিক মানুষ বিপদে পড়বেন।”

যদিও সহকারী ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারের পদত্যাগ নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি হাওড়া জেলার জেলাশাসক পি. দীপপ প্রিয়া।

এদিকে সমাজকর্মী সুমন সেনগুপ্ত এক পোস্টে লেখেন, “যখন নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব অফিসাররা পদত্যাগ করেন, তখন বিশেষ নিবিড় সংশোধনের আসল উদ্দেশ্য ও কেলেঙ্কারি প্রকাশ পায়! এখন আর এই বিষয়টি কিন্তু শুধু রাজনৈতিক অভিযোগ নয়। এটা এখন খোদ নির্বাচন কমিশনের ভিতর থেকেই অভিযোগ। বাগনানের এক AERO মৌসম সরকার পদত্যাগ করেছেন। তাঁর পদত্যাগপত্রে তিনি লিখেছেন, দেশের সহনাগরিকদের এই হয়রানি তিনি আর সহ্য করতে পারছেন না। তিনি আরও লিখেছেন, এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই দুরভিসন্ধি আছে, মানুষকে বাদ দেওয়ার চক্রান্ত আছে। এই প্রক্রিয়া প্রশাসনিকভাবে অসৎ, এবং নৈতিকভাবে অপ্রতিরোধ্য।”

তিনি আরও উল্লেখ করেছপন, “২০০২ সালের নির্বাচক তালিকাকে পিডিএফ থেকে ডিজিটাল ফরম্যাটে রূপান্তর করার সময় বিক্ষিপ্ত এবং স্বীকার্য ত্রুটির কারণে “যৌক্তিক অসঙ্গতি” তৈরী হয়েছে, তার ফলেই বহু মানুষের নাম প্রাথমিকভাবেই বাদ পড়েছে। সেই জন্যেই অসংখ্য মানুষকে এখন হাজিরা দিতে হচ্ছে। বয়স্ক, বৃদ্ধ, অথর্ব মানুষদেরও লাইনে দাঁড়িয়ে কমিশন নির্দিষ্ট নথি দিয়ে প্রমাণ করতে হচ্ছে তিনি এই দেশের নাগরিক।”

সুমন সেনগুপ্তর কথায়, “কমিশনের নিয়ম অনুসারে ফর্ম ৮ এর মাধ্যমে আইনত সংশোধন করা নামগুলি উপেক্ষা করা হয়েছে৷ পরিবর্তে, কমিশন ২০০২ সালের বানানগুলিকেই সত্য হিসাবে বিবেচনা করে, ইচ্ছাকৃতভাবে পিতার নামের অমিল এবং “সন্তান ম্যাপিং” ত্রুটিগুলি তৈরি করেছে এবং সঠিক মানুষকে হয়রানি করছে। তাই আজকের বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রেও সামনের পাতায় লিখতে হয়েছে অন্তত ৭০ শতাংশ অমিল আছে, ২০২৫ সালের তালিকার সঙ্গে ২০০২ সালের তালিকার এবং সেই সংক্রান্ত ম্যাপিং এবং অন্যান্য বিষয়ের। এমনকি ২০০২ সালের তালিকাতে বয়স এবং লিঙ্গের তথ্যও ত্রুটিপূর্ণ ছিল, পরে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংশোধন করা হয়েছিল, যা বর্তমান এসআইআর স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করছে এখন। বেশ কিছু ক্ষেত্রে, ভোটারদের নাম ‘Ya’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, বা অন্য কথায়, ত্রুটিপূর্ণ সিস্টেমের মাধ্যমে জাল নাম তৈরি করা হয়েছে। এই সমস্ত কিছু দেখলে একটা কথাই পরিষ্কার যে এই প্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃত ভুল করার জন্যেই করা হয়েছে। স্পষ্ট ভাষায়, সোজা করে বললে AERO পদত্যাগ করেছেন কারণ তিনি দেখেছেন এই প্রক্রিয়াটি আসলে কী। তিনি পদত্যাগ করেছিলেন যাতে তিনি এই জ্ঞান নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন যে তিনি সচেতনভাবে তার দেশবাসী বা জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি।” সমাজকর্মী সাফ বলেছেন, “আমরা কি বুঝতে পারছি, না বুঝেও চোখ বুঝে থাকতে চাইছি? নাকি এখনো ভাবছি, এই প্রক্রিয়ায় তৃণমূলের ক্ষতি হবে? আসলে এই প্রক্রিয়া দরিদ্রতম এবং সবচেয়ে প্রান্তিকদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার একটি ইচ্ছাকৃত চক্রান্ত।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!