ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণ করেছে মার্কিন সেনারা। এই ঘটনায় বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ভেনেজুয়েলার উপরাষ্ট্রপতি ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, সরকার মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীর অবস্থান সম্পর্কে কিছুই জানে না। শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত একটি অডিও বার্তায় রদ্রিগেজ বলেন, মাদুরো ও ফ্লোরেস যে এখনও জীবিত—তার প্রমাণ দাবি করছে সরকার। প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করা নিয়ে দু’দেশের মধ্যে শুরু হয়েছে কূটনৈতিক চাপানউতোর।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির পটভূমিতে রয়েছে ক্যারিবিয়ান সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন বাহিনীর ধারাবাহিক প্রাণঘাতী হামলা। ওয়াশিংটনের দাবি, ওই হামলাগুলি মাদক পাচারে যুক্ত নৌকা লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। পাশাপাশি, ভেনেজুয়েলার মাদকবাহী নৌকার কথিত ডকিং এলাকায়ও হামলা চালানো হয়েছে।
এদিকে মাদুরোকে যে কায়দায় অপহরণ করা হয়েছে, তা অতীতের কিছু নজিরের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। এভাবে একটি দেশে ঢুকে সে দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক বা গ্রেফতার করে নিয়ে আসার বিস্তর ইতিহাস রয়েছে আমেরিকার। পানামার প্রাক্তন সামরিক শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগা কিংবা ইরাকের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেনের মতো নেতাদের আটক করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
ম্যানুয়েল নরিয়েগা
লাতিন আমেরিকায় সরাসরি হস্তক্ষেপের আরেক দৃষ্টান্ত হিসেবে ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র পানামায় আক্রমণ চালায়। উদ্দেশ্য ছিল সামরিক শাসক ও কার্যত রাষ্ট্রনায়ক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সে সময় পানামায় অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের নিরাপত্তা, অগণতান্ত্রিক শাসন, দুর্নীতি ও মাদক পাচারের অভিযোগ তুলে এই অভিযানের যুক্তি দেখায়।
এর আগে ১৯৮৮ সালে মিয়ামিতে মাদক পাচারের অভিযোগে নরিয়েগার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে যুক্তরাষ্ট্র—যেমনটি মাদুরোর ক্ষেত্রেও করা হয়েছে। নরিয়েগা ১৯৮৫ সালে নিকোলাস আরদিতো বারলেত্তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেন, ১৯৮৯ সালের নির্বাচন বাতিল করেন এবং দেশে মার্কিন-বিরোধী মনোভাবকে উসকে দেন।
পানামায় এই অভিযান ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। মার্কিন সরকার দাবি করেছিল, নরিয়েগাকে যুক্তরাষ্ট্রে এনে মাদক পাচারের মামলায় বিচারের মুখোমুখি করা হলে পানামাবাসীর অবস্থার উন্নতি হবে।
পরবর্তীতে নরিয়েগাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে গিয়ে বিচার করা হয় এবং ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে বন্দি ছিলেন। পরে তাঁকে ফ্রান্সে প্রত্যর্পণ করা হয় আরেকটি মামলার জন্য। এক বছর পর তাঁকে ফের পানামায় পাঠানো হয়। শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালে পানামার কারাগারেই তাঁর মৃত্যু হয়।
সাদ্দাম হুসেন
ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেনকে ২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর মার্কিন বাহিনী আটক করে, যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন আগ্রাসন ও দখলদারির প্রায় নয় মাস পরে। ওই আগ্রাসনের কারণ হিসেবে ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র (WMD) থাকার ভুয়ো গোয়েন্দা তথ্যকে তুলে ধরা হয়েছিল।
নরিয়েগার মতোই, সাদ্দামও একসময় ওয়াশিংটনের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ছিলেন—বিশেষত ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়, যাতে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়।
২০০৩ সালের যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিহীনভাবে দাবি করেছিল যে সাদ্দাম আল-কায়েদার মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন করতেন। তবে ইরাকে কখনও কোনও গণবিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায়নি।
নিজ শহর তিকরিতের কাছে একটি গর্তে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় সাদ্দামকে আটক করা হয়। ইরাকি আদালতে বিচারের পর মানবতাবিরোধী অপরাধে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজ
হন্ডুরাসের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হুয়ান অরল্যান্ডো হার্নান্দেজের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিচারিতার অভিযোগকেই সামনে আনে বলে মত পর্যবেক্ষকদের একাংশের।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে, রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার কয়েক দিনের মধ্যেই, তেগুসিগালপায় তাঁর বাড়ি থেকে মার্কিন এজেন্ট ও হন্ডুরাসি বাহিনীর যৌথ অভিযানে হার্নান্দেজকে আটক করা হয়। ওই বছরের এপ্রিলে দুর্নীতি ও মাদক পাচারের অভিযোগে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করা হয় এবং জুনে তাঁকে ৪৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে ক্ষমা করে দেন। এর কয়েক দিনের মধ্যেই হন্ডুরাসের প্রধান কৌঁসুলি হার্নান্দেজের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পরপরই প্রাক্তন এই নেতাকে ঘিরে নতুন করে আইনি ও রাজনৈতিক সংকট তীব্র হয়।
(সূত্র: আলজাজিরা || অনুবাদ: সুরাইয়া সুমি সরকার)
