ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল-এ মাদকাসক্তদের চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত একটি হাসপাতালে ভয়াবহ বিমান হামলার ঘটনায় শতাধিক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই হামলার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছে তালিবান সরকার। যদিও ইসলামাবাদ এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
তালিবান সরকারের উপ-মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা প্রায় ৪০০-তে পৌঁছেছে এবং আহত হয়েছেন অন্তত ২৫০ জন। নিহত ও আহতদের অধিকাংশই ছিলেন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী। আফগান সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শরাফত জামান জানান, হামলার সময় রাষ্ট্রীয় পরিচালিত ‘ওমিদ’ হাসপাতালে প্রায় ৩,০০০ রোগী ভর্তি ছিলেন।
স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলির ফুটেজে দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আগুন নেভাতে হিমশিম খাচ্ছেন দমকলকর্মীরা। হাসপাতালের নিরাপত্তারক্ষী আহমদ (৫০) জানান, “পুরো জায়গাটা আগুনে পুড়ে গিয়েছিল, যেন কিয়ামতের দিন।” হাসপাতালের কর্মীদের ডরমিটরিতে থাকা ২৫ জনের মধ্যে তিনি একমাত্র জীবিত রয়েছেন বলে দাবি করেন।
সোমবার রাত প্রায় ৯টা নাগাদ হামলা শুরু হয় বলে জানা গেছে। আরেক নিরাপত্তারক্ষী ওমিদ স্টানিকজাই জানান, প্রথমে বিমানবিধ্বংসী অস্ত্র থেকে গুলি ছোড়া হয়। “চারদিকে সামরিক ইউনিট ছিল। তারা গুলি চালানোর পর যুদ্ধবিমান বোমা ফেলে এবং মুহূর্তেই আগুন ধরে যায়,” বলেন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের পর হাসপাতালের একাধিক অংশ ভেঙে পড়ে। মঙ্গলবার সকালে সেখানে শুধু পোড়া দেয়াল ও ধ্বংসস্তূপের স্তূপ দেখা যায়, যেখানে উদ্ধারকর্মীরা এখনও জীবিতদের খোঁজ চালাচ্ছেন। অ্যাম্বুলেন্স চালক হাজি ফাহিম বলেন, “সবকিছু জ্বলছিল, মানুষ পুড়ছিল। সকালে আবার ডাকা হয়, কারণ ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও লাশ রয়েছে।”
হাসপাতালের এক রোগী ইউসুফ রহিম বলেন, “বিস্ফোরণের সময় আমরা ওয়ার্ডে ছিলাম। চারদিকে ধোঁয়া আর আগুন ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে বিছানা থেকে পড়ে যায়, চিৎকার করতে থাকে। অনেকেই ঘটনাস্থলেই মারা যায়।” তিনি জানান, আহত অবস্থায় দেহের ওপর দিয়ে পা ফেলে কোনওভাবে বাইরে বেরিয়ে আসেন।
ইতালীয় এনজিও Emergency NGO-এর আফগানিস্তান প্রধান ডেজান পানিক জানান, তারা তিনটি মৃতদেহ গ্রহণ করেছে এবং অন্তত ২৭ জন আহতের চিকিৎসা করছে।
এদিকে, জাতিসংঘ-এর আফগানিস্তান বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি রিচার্ড বেনেট এই হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে হাসপাতালের মতো বেসামরিক স্থাপনার সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলেন।
তবে পাকিস্তান এই হামলার দায় অস্বীকার করে জানিয়েছে, তারা কেবল সামরিক ঘাঁটি ও সন্ত্রাসবাদী অবকাঠামো লক্ষ্য করে “নির্ভুল” হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, কাবুলে তালিবান ও পাকিস্তানবিরোধী জঙ্গিদের ঘাঁটি লক্ষ্য করেই এই অভিযান চালানো হয় এবং হাসপাতাল লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ “ভুল ব্যাখ্যা”।
উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এটি তৃতীয়বার যখন কাবুলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ উঠল। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে এবং পরিস্থিতিকে “খোলা যুদ্ধ” হিসেবে বর্ণনা করেছে ইসলামাবাদ।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়, যখন আফগানিস্তান পাল্টা হামলা চালায় পাকিস্তানের বিমান হামলার জবাবে। এর ফলে কাতারের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতিও ভেঙে পড়ে। মূলত সীমান্তপারের জঙ্গি কার্যকলাপকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পাকিস্তান অভিযোগ করে, আফগান তালেবান পাকিস্তান তালেবানসহ বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিচ্ছে—যা আফগান সরকার অস্বীকার করে এসেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চীন মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও তা সফল হয়নি। সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে সীমান্ত এলাকাতেও। সোমবার আফগানিস্তানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে গোলাগুলিতে দুই শিশুসহ চারজন নিহত ও ১০ জন আহত হন। অন্যদিকে, রবিবার পাকিস্তানের বাজাউর জেলায় আফগানিস্তান থেকে ছোড়া মর্টার হামলায় একই পরিবারের চার সদস্য নিহত হন। এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ আরও বেড়েছে, এবং দুই দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সংঘর্ষের আশঙ্কা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
