ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া নতুন সামরিক সংঘাতের নাটকীয় সূচনা ঘটেছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। শনিবার ভোরে তেহরানে তাঁর বাসভবনে চালানো এক মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় নিহত হন ৮৬ বছর বয়সি এই শীর্ষ ধর্মীয় নেতা। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম পরদিন সকালে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। ইসরায়েলের সামরিক সূত্র এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে, হামলায় ব্যবহার করা হয়েছিল অত্যন্ত শক্তিশালী আকাশ থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ‘ব্লু স্প্যারো’। এই ক্ষেপণাস্ত্রটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অনেক ওপরে উঠে গিয়ে পুনরায় অত্যন্ত উচ্চগতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে নেমে আসে। ফলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে তা প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
মহাকাশসীমা ছুঁয়ে ফেরে যে ক্ষেপণাস্ত্র
‘ব্লু স্প্যারো’ ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি কোয়াসি-ব্যালিস্টিক গতিপথ অনুসরণ করে। অর্থাৎ উৎক্ষেপণের পর এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অনেক ওপরে উঠে গিয়ে প্রায় মহাকাশসীমা স্পর্শ করে এবং সেখান থেকে তীব্র গতিতে নিচের লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধেয়ে আসে।
মূলত ইসরায়েলের ‘স্প্যারো’ ক্ষেপণাস্ত্র পরিবারের অংশ হিসেবে এটি তৈরি করা হয়েছিল। এই পরিবারে ‘ব্ল্যাক স্প্যারো’ ও ‘সিলভার স্প্যারো’ নামের আরও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। প্রথমদিকে এগুলো সোভিয়েত আমলের স্কাড ক্ষেপণাস্ত্রের অনুকরণে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা পরীক্ষার জন্য তৈরি করা হলেও পরে তা অভিযানে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হয়। প্রায় ৬.৫ মিটার লম্বা এবং প্রায় ১.৯ টন ওজনের এই ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার। সাধারণত ম্যাকডোনেল ডগলাস এফ-১৫ ঈগল যুদ্ধবিমান থেকে এটি উৎক্ষেপণ করা হয়। উৎক্ষেপণের পর একটি বুস্টার রকেট ক্ষেপণাস্ত্রটিকে মহাকাশসীমার কাছাকাছি নিয়ে যায়, এরপর তা বিচ্ছিন্ন হয়ে দ্রুতগতিতে পুনরায় বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।

এই খাড়া গতিপথের কারণে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় খুব কম থাকে, ফলে অত্যন্ত সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতেও হঠাৎ আঘাত হানতে সক্ষম হয় ক্ষেপণাস্ত্রটি। বিশ্লেষকদের ধারণা, ক্ষেপণাস্ত্রটির উড্ডয়নপথ তেহরানের দিকে যাওয়ার সময় ইরাকের আকাশসীমা অতিক্রম করেছিল। হামলার পর সেখানে ক্ষেপণাস্ত্রের কিছু ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে বলে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন।
‘অপারেশন এপিক ফিউরি’
এই হামলাটি ছিল ইসরায়েলের বৃহত্তর সামরিক অভিযানের অংশ, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো। ইসরায়েলি সূত্র অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে সাতটার কিছু পর যুদ্ধবিমানগুলো উড্ডয়ন করে এবং প্রায় দুই ঘণ্টা পরে নির্ধারিত উৎক্ষেপণ অবস্থানে পৌঁছায়। সকাল প্রায় ৯টা ৪০ মিনিট নাগাদ খামেনিয়ের বাসভবন এবং আশপাশের স্থাপনাকে লক্ষ্য করে প্রায় ৩০টি নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রিত অস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এর মধ্যে কয়েকটি ছিল ব্লু স্প্যারো ক্ষেপণাস্ত্র। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তেহরানের বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে পাস্তুর স্ট্রিটে অবস্থিত সর্বোচ্চ নেতার বাসভবনের আশপাশে ঘন ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। পরবর্তী স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, কমপ্লেক্সের ভেতরের একাধিক ভবন গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বহু বছরের গোয়েন্দা নজরদারি
ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং সামরিক সাইবার গোয়েন্দা ইউনিট ৮২০০-এর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফল ছিল এই হামলা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক বছর ধরে খামেনিয়ের নিরাপত্তা দলের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং তাঁর বাসভবনের আশপাশের কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করা হচ্ছিল। গোয়েন্দা নজরদারির অংশ হিসেবে তেহরানের বিভিন্ন ট্রাফিক ক্যামেরা হ্যাক করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি যোগাযোগ নেটওয়ার্কও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল, যার মাধ্যমে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের দৈনন্দিন গতিবিধির একটি বিশদ “প্যাটার্ন অব লাইফ” তৈরি করা হয়।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, শনিবার সকালে খামেনির সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠকে অংশ নিতে একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা তাঁর বাসভবনে উপস্থিত থাকবেন। সেই তথ্য পাওয়ার পরই হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
হামলার সময় নির্ধারণ
ইরানের কর্মকর্তাদের মতে, খামেনি সাম্প্রতিক সময়ে বেশিরভাগ রাত কাটাতেন তাঁর বাসভবনের নিচে অবস্থিত গভীর ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে, যা বিমান হামলা থেকে তাঁকে সুরক্ষা দেবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। এই কারণে ইসরায়েলি পরিকল্পনাকারীরা অপেক্ষা করছিলেন এমন একটি মুহূর্তের জন্য যখন তিনি এবং তাঁর শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা মাটির ওপর অবস্থান করবেন। হামলার কিছুক্ষণ আগে ইসরায়েলি সাইবার ইউনিটগুলো ওই এলাকায় মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কে বিঘ্ন ঘটায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছাতে না পারে।
ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার সময় খামেনি এবং তাঁর সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-সহ ইরানের সামরিক নেতৃত্বের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।
হামলায় খামেনি ছাড়াও আইআরজিসির একাধিক জ্যেষ্ঠ কমান্ডার নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকের সময় উপস্থিত থাকা তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যও নিহতদের মধ্যে থাকতে পারেন। এই হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে এবং পরিস্থিতি দ্রুত বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে আন্তর্জাতিক মহলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
