নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণভেরি বাজতেই মুর্শিদাবাদের ডোমকল বিধানসভা কেন্দ্রে পা রাখলেন তৃণমূল কংগ্রেসের হাই-প্রোফাইল প্রার্থী, প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীর। বুধবার ডোমকলে পা রেখেই প্রচারের ময়দান গরম করলেন তিনি। একদিকে যেমন নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ সুপারের দপ্তরে হাজির হলেন, অন্যদিকে ‘বহিরাগত’ বিতর্ক ও অধীর চৌধুরীর পুরনো অভিযোগের পাল্টা জবাব দিয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করলেন এই প্রাক্তন পুলিশ কর্তা। প্রার্থী ঘোষণার পর বুধবার প্রথমবার নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র ডোমকলে পৌঁছে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। ডোমকল ব্লক তৃণমূল কংগ্রেস কার্যালয়ে স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন তৃণমূলের নবাগত প্রার্থী।
‘বহিরাগত’ প্রার্থী প্রসঙ্গে বিরোধীদের কটাক্ষের জবাবে হুমায়ুন কবীর স্পষ্ট ভাষায় জানান, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা ভেবেচিন্তেই নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি এই জেলায় প্রায় পাঁচ বছর কাজ করেছি। কান্দিতে দু’বছর এসডিপিও এবং পরবর্তী সময়ে চার বছর পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। জেলার মানুষ আমার কাজ দেখেছেন, আমাকে চেনেন। আমার বাড়ি এখানে না হলেও এই জেলার সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। যদি তাও আমাকে বহিরাগত বলা হয়, তাতে আমার কিছু যায় আসে না।” এরপরই আত্মবিশ্বাসের সুরে তিনি আরও বলেন, “ডোমকলের জয় নিয়ে আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত। জেতার পর ডোমকলেই ঘর ভাড়া নিয়ে থাকব এবং এলাকার মানুষের উন্নয়নের জন্য সর্বস্ব দিয়ে কাজ করব।”
নিজের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘদিন প্রশাসনে কাজ করেছি। জানি, কোন সুইচ টিপলে কোন আলো জ্বলে। সেই অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগিয়ে ডোমকলের উন্নয়নে কাজ করতে চাই।” ডোমকল কেন্দ্র থেকে জয়ের ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী বলেও দাবি করেন। নির্বাচনে জয়ী হলে এলাকার মানুষের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়ে হুমায়ুন কবীর বলেন, “ডোমকলের মানুষ আমাকে জেতালে আমি এখানেই থাকব। ঘর ভাড়া নিয়ে বসবাস করব এবং সর্বশক্তি দিয়ে উন্নয়নের কাজ করব। শুধু ডোমকল নয়, গোটা মুর্শিদাবাদের মানুষের সঙ্গে আমার আবেগের সম্পর্ক রয়েছে।”
এদিকে, প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ও বহরমপুরের প্রাক্তন সাংসদ অধীর চৌধুরীর তোলা গুরুতর অভিযোগ প্রসঙ্গেও এদিন প্রতিক্রিয়া দেন তিনি। বহরমপুরের প্রাক্তন সাংসদ অধীর চৌধুরী সসম্প্রতি অভিযোগ করেছিলেন, তৎকালীন এসপি হুমায়ুন কবীর তাঁকে খুনের পরিকল্পনা করেছিলেন। এদিন সেই প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবীর চাঁছাছোলা ভাষায় বলেন, “আমি কাউকে মেরে হাত গন্ধ করি না। আমি জেলার পুলিশ সুপার ছিলাম, আইন মেনে কাজ করেছি। আমাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল, মানুষ মারার জন্য নয়।”
এদিন ডোমকলের প্রয়াত বিধায়ক জাফিকুল ইসলামের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান হুমায়ুন কবীর। তিনি জানান, জাফিকুল সাহেবের সাথে তাঁর গভীর সুসম্পর্ক ছিল এবং বিধানসভাতেও তাঁদের নিয়মিত দেখা হতো। জাফিকুল সাহেবের মৃত্যুর সময় তিনি বাইরে থাকায় শেষ দেখা হয়নি, তাই এদিন তাঁর পরিবারের সাথে দেখা করতে যাওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেন তৃণমূলের এই হাই-প্রোফাইল প্রার্থী। হুমায়ুনের কথায়, “জাফিকুল ইসলাম আমাকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। তাঁর মৃত্যুর সময় আমি বাইরে ছিলাম, শেষ দেখা হয়নি। তাই তাঁর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাব।”
অন্যদিকে, নির্বাচনী প্রচার শুরু হওয়ার আগেই নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এই প্রাক্তন পুলিশ কর্তা। বুধবার মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশ সুপারের দপ্তরে গিয়ে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন জানান তিনি। বর্তমান পুলিশ সুপারের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আমার কাছে নানা দিক থেকে হুমকি আসছে। আমি যাতে নিরাপত্তার সঙ্গে নির্বিঘ্নে প্রচার চালাতে পারি, সেই কারণেই পুলিশের কাছে আবেদন জানিয়েছি।”
সব মিলিয়ে ডোমকল কেন্দ্রকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। মুর্শিদাবাদের প্রতিটি গলি ও থানার অবস্থান যাঁর নখদর্পণে, সেই ‘সাবেক বস’ হুমায়ুন কবীর এবার ডোমকলের রণাঙ্গনে তৃণমূলের প্রধান সৈনিক। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা আর রাজনৈতিক কৌশলের মিশেলে তিনি ডোমকলের ভোট সমীকরণ কতটা ঘাসফুল শিবিরের অনুকূলে আনতে পারেন, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
