নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: বাংলাভাষী মানুষদের হেনস্তা, নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার প্রশ্নে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার নিউটাউনে দুর্গা অঙ্গনের শিলান্যাস অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা করব, মনুষ্যত্ব বাঁচিয়ে দাও, অশুভ শক্তির বিনাশ কর। মানুষকে বড্ড হয়রান হতে হচ্ছে। এক মাসে ৫০ জনের বেশি মানুষ মারা গিয়েছেন। এটা আর সহ্য হচ্ছে না।” সমাজে বাড়তে থাকা অশান্তি ও মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “বাংলায় থেকে নিজেকে ভারতীয় নাগরিক প্রমাণ করতে হবে? নাগরিকত্বের সঙ্গে ভোটাধিকারের কী সম্পর্ক?” তাঁর অভিযোগ, “বাংলায় কথা বললেই বলছে, বাংলাদেশি। এমনকি হোটেলে জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না।”
স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার অবদানের কথা তুলে ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “স্বাধীনতা সংগ্রামে যদি ৬০০ জনের ফাঁসি হয়ে থাকে, তার মধ্যে ৫০০ জনই ছিলেন বাংলার।” ধর্মনিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা, তিনি কোনও ধর্মের তোষণ করেন না। বলেন, “আমি প্রকৃত অর্থে সেকুলার। সর্বধর্ম সমন্বয়ে বিশ্বাস করি। এমন কোনও ধর্ম নেই, যাদের অনুষ্ঠানে আমি যাই না।” গুরুদ্বারায় মাথা ঢেকে যাওয়া বা হিন্দু রীতিতে গায়ে চাদর দেওয়া—এই উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সব ধর্মের রীতিকেই তিনি সম্মান করেন।
এদিন গঙ্গাসাগর সংযোগকারী সেতু নির্মাণ নিয়েও বড় ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, আগামী দু’বছরের মধ্যেই সেতু তৈরি হয়ে যাবে, ফলে আর কাউকে জল পেরিয়ে গঙ্গাসাগরে যেতে হবে না। তিনি জানিয়েছেন, “১৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে, টেন্ডার হয়েছে, টাকা দেওয়া হয়ে গিয়েছে। আগামী ৫ জানুয়ারি শিলান্যাস করতে যাচ্ছি, তারপরই কাজ শুরু হবে।”
জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে মহাকাল মন্দির প্রকল্পেরও শিলান্যাস হবে। জমি চিহ্নিত, নকশা প্রস্তুত এবং অর্থের ব্যবস্থাও হয়ে গিয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। দুর্গা মন্দির ট্রাস্টে জমা অর্থে মূর্তির খরচ উঠে এসেছে, বাকি পরিকাঠামোর জন্য হিডকো ও রাজ্য সরকারের তরফে ২৫০–৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
দুর্গা অঙ্গন প্রকল্পের খুঁটিনাটি তুলে ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ১৭.২৮ একর জমির উপর গড়ে উঠবে বিশ্বের বৃহত্তম দুর্গা অঙ্গন। প্রায় ২ লক্ষ বর্গফুট এলাকায় এই চত্বরে একসঙ্গে হাজার জন বসতে পারবেন। থাকবে সবুজে ঘেরা খোলা প্রাঙ্গণ, ২০ ফুট চওড়া রাস্তা, ১০০৮টি স্তম্ভ, নকশা করা খিলান, ৫৪ মিটার উঁচু গর্ভগৃহ, ১০৮ দেবদেবীর মূর্তি ও ৫৪টি সিংহমূর্তি। এছাড়াও শিব, গণেশ, কার্তিক ও সরস্বতীর জন্য আলাদা মণ্ডপ, প্রদক্ষিণ পথ ও পবিত্র কুণ্ড থাকবে। মমতার কথায়, ৩৬৫ দিন দুর্গাপুজো ও দর্শনের ব্যবস্থা থাকবে। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি ও সম্মান সংরক্ষণের লক্ষ্যেই এই মন্দির তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিদিন লক্ষাধিক দর্শনার্থী আসতে পারবেন বলে লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। মন্দির চত্বর জুড়ে ৩০০-র বেশি গাছ ও ১০০০ ফুলের গাছ লাগানো হবে, এবং প্রকল্পটি গ্রিন বিল্ডিং হিসেবেই গড়ে তোলা হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, এই প্রকল্পের মাধ্যমে যেমন ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষিত হবে, তেমনই দোকান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পর্যটনের মাধ্যমে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
