ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার ফাঁকফোকর এবং জাল নথির সহায়তায় সরকারি কোষাগারে বিশাল থাবা। আইডিএফসি ফার্স্ট ব্যাঙ্ককে (IDFC First Bank) কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক ভয়াবহ জালিয়াতির পর্দাফাঁস করল হরিয়ানা অ্যান্টি-করাপশন ব্যুরো (ACB)। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, প্রায় ৫৯০ কোটি টাকার সরকারি তহবিল অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই ব্যাঙ্কের কর্মচারী এবং সরকারি আধিকারিকসহ ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি।
তদন্তকারীদের দাবি, এই জালিয়াতি কোনো সাধারণ চুরি নয়, বরং এটি ছিল একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও পরিশীলিত ‘র্যাকেট’। অভিযুক্তরা সরকারি অর্থ সরানোর জন্য একগুচ্ছ ভুয়ো বা ‘শেল’ কোম্পানি তৈরি করেছিল। তদন্তে উঠে এসেছে RS Traders, Cap Co Fintech Services, SRR Planning Gurus Pvt. Ltd. এবং Swastik Desh Project-এর মতো একাধিক ভুয়ো প্রতিষ্ঠানের নাম। সরকারি বিভাগগুলোর অ্যাকাউন্ট থেকে এই সমস্ত ভুয়া
কোম্পানির অ্যাকাউন্টে টাকা সরানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল তিন স্তরের জালিয়াতি:
১. ফোরজড ডেবিট মেমো: ব্যাঙ্কের নথিতে জাল ডেবিট মেমো তৈরি করা হয়েছিল।
২. মনগড়া ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট: লেনদেনের প্রকৃত তথ্য আড়াল করতে সরকারি দপ্তরে ভুয়া স্টেটমেন্ট জমা দেওয়া হতো।
৩. অননুমোদিত ট্রান্সফার: কোনো বৈধ চেক বা অনুমোদন ছাড়াই ডিজিটাল মাধ্যমে সরাসরি টাকা সরিয়ে ফেলা হতো।
স্টেট ভিজিল্যান্স অ্যান্ড অ্যান্টি-করাপশন ব্যুরোর (SV&ACB) অতিরিক্ত ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ, চারু বালি জানান, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি পঞ্চকুলা থানায় এই মর্মে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। আইডিএফসি ফার্স্ট ব্যাঙ্ক এবং এইউ স্মল ফিন্যান্স ব্যাঙ্কের অজ্ঞাতপরিচয় আধিকারিকদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক এফআইআর নথিভুক্ত করা হয়।
তদন্তে দেখা গেছে, মোট ৮টি সরকারি দপ্তরের ১২টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এই জালিয়াতির শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি অ্যাকাউন্টই ছিল চণ্ডীগড়ের সেক্টর ৩২-স্থিত আইডিএফসি ফার্স্ট ব্যাঙ্কে এবং বাকি ২টি ছিল এইউ স্মল ফিন্যান্স ব্যাঙ্কে।
এখনও পর্যন্ত এই মামলায় মোট ১১ জন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের প্রোফাইল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, অপরাধের জাল কতটা গভীরে ছড়িয়ে ছিল। ব্যাঙ্ক কর্মচারী ৬ জন (যারা অভ্যন্তরীণ লেনদেনে সহায়তা করত)। বেসরকারি ব্যক্তি ৪ জন (যারা ভুয়ো কোম্পানিগুলো পরিচালনা করত)। সরকারি কর্মচারী ১ জন (যিনি বিভাগীয় তথ্য পাচার করতেন)। বর্তমানে ধৃতদের মধ্যে ১০ জন বিচার বিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন এবং একজনকে পুলিশি রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
অপরাধের টাকা দিয়ে অভিযুক্তরা যে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছিল, তার প্রমাণ পেয়েছে এসিবি। তদন্তকারী সংস্থাটি এখনও পর্যন্ত ১৬টি স্থানে তল্লাশি চালিয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে, ৩টি ফরচুনার, ২টি ইনোভা এবং ১টি মার্সিডিজ বেঞ্জসহ মোট ৬টি গাড়ি। ২৫টিরও বেশি মোবাইল ফোন এবং ল্যাপটপ, যা বর্তমানে সাইবার ফরেন্সিক ল্যাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। ১০টি এমন সম্পত্তি চিহ্নিত করা হয়েছে যা অপরাধের টাকা দিয়ে কেনা বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ১০০টিরও বেশি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে লেনদেন বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও জোরালো করতে গত এক বছরের সমস্ত লেনদেনের একটি পূর্ণাঙ্গ অডিট করা হচ্ছে। এসিবি জানিয়েছে, অডিট এখন শেষ পর্যায়ে। সিসিটিভি ফুটেজ এবং বাজেয়াপ্ত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে যে, ধৃতরা বাদেও আরও কতজন উচ্চপদস্থ আধিকারিক এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। যদিও এখনও পর্যন্ত কোনো সিনিয়র অফিসারের সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়ে এসিবি মুখ খোলেনি।
তদন্তকারী সংস্থা জানিয়েছে, তারা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সাথে সমন্বয় রেখে কাজ করছে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে যে, সরকারি তহবিলগুলো সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অভিযুক্তদের পরিবার এবং আত্মীয়দের অ্যাকাউন্টেও পাঠানো হয়েছিল। হরিয়ানা সরকার এই মামলাটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছে। রাজ্য ভিজিল্যান্স ব্যুরোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তদন্ত বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আগামী দিনে আরও বড় কোনো নাম এই তালিকায় যুক্ত হতে পারে বলে সম্ভাবনা রয়েছে।
