TOP NEWS

ইরান–আমেরিকা সংঘাত: স্বল্পমেয়াদি অভিযান নাকি দীর্ঘ যুদ্ধ? ট্রাম্পের সামনে অগ্নিপরীক্ষা!

ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাত ক্রমেই নতুন মাত্রা পাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন যে বার্তা দিয়েছেন, তাতে স্পষ্ট—এই যুদ্ধ অতীতের ইরাক যুদ্ধের মতো সহজ বা দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং একাধিক সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে ওয়াশিংটন।

পেন্টাগনে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে হেগসেথ বলেন, “এটি ইরাক নয়। এটি অন্তহীন যুদ্ধও নয়। এই যুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শর্ত নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্র।” তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কোনো কল্পনাপ্রসূত বা ইউটোপিয়ান নয়; বরং তা বাস্তবসম্মত এবং মার্কিন জনগণ ও মিত্রদের নিরাপত্তা রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে পরিস্থিতি যে দ্রুত জটিল হয়ে উঠছে, তা স্বীকার করেছেন মার্কিন সামরিক নেতৃত্বও।

শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র

২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় মার্কিন সেনাবাহিনী খুব দ্রুতই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেই সময়ের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ডের সংবাদ সম্মেলনের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করলে পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এইবার যুক্তরাষ্ট্রের সামনে রয়েছে অনেক বেশি শক্তিশালী ও প্রস্তুত প্রতিপক্ষ—ইরান। জেনারেল ড্যান কেইন জানিয়েছেন, ইরান ইতিমধ্যেই শত শত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, যার লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনা, ইসরায়েলের বিভিন্ন শহর এবং কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান ও ইরাকে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো।

এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত সেনা ও অস্ত্র মোতায়েন করতে হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। কেইনের কথায়, বর্তমান বাহিনী হয়তো সংঘাতের মোকাবিলায় যথেষ্ট নাও হতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে আরও সামরিক শক্তি পাঠানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

কুয়েতে মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত

সংঘাতের মাঝেই নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে কুয়েতে তিনটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা। পেন্টাগনের দাবি, এগুলো “ফ্রেন্ডলি ফায়ার” বা নিজেদের পক্ষের ভুল হামলার ফলে ধ্বংস হয়েছে। ঘটনার সঠিক কারণ এখনও স্পষ্ট নয়, তবে এটি সংঘাতের ঝুঁকি কতটা দ্রুত বাড়ছে তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। এর আগে সোমবার সকালে পেন্টাগনের ব্রিফিংয়ের আগেই এই ঘটনার খবর প্রকাশ্যে আসে।

ট্রাম্পের সতর্কবার্তা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধের সম্ভাব্য মূল্য নিয়েও সতর্ক করেছেন। নির্বাচনী প্রচারে তিনি “চিরস্থায়ী যুদ্ধ” বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ইরানের সঙ্গে বর্তমান সংঘাত সেই অবস্থানকে নতুন প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ট্রাম্প ইতিমধ্যেই স্বীকার করেছেন যে, সংঘাতে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, যুদ্ধ কতদিন চলবে তা এখনও নিশ্চিত নয়।

একসময় তিনি বলেছিলেন, প্রয়োজনে এই যুদ্ধ দুই-তিন দিনের মধ্যেই শেষ করা যেতে পারে। আবার অন্যদিকে তিনি বলেছেন, সংঘাত চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় ধরে চলতে পারে। এই দ্বৈত বক্তব্য ওয়াশিংটনের প্রকৃত লক্ষ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।

যুদ্ধের সহনশীলতা: সামরিক নয়, রাজনৈতিক প্রশ্ন

লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক এবং “মেনা অ্যানালিটিকা”-র পরিচালক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মনে করেন, এই সংঘাতের মূল প্রশ্ন সামরিক শক্তি নয়, বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহনশীলতা। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক দিক থেকে বহু মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যে অভিযান চালানোর ক্ষমতা রাখে। কিন্তু প্রকৃত সীমাবদ্ধতা আসবে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং মিত্র দেশগুলোর উদ্বেগ থেকে।

বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের হামলার ফলে বাণিজ্য, জাহাজ চলাচল এবং বিমান চলাচলে দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

হরমুজ প্রণালী নিয়ে উত্তেজনা

সংঘাত শুরুর পরপরই ইরান সতর্ক করে দিয়েছে যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রবেশ করা যে কোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যদি এই পথ দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হয়, তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে এবং তার প্রভাব পড়বে বিশ্বের বহু দেশের অর্থনীতিতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ তৈরি করবে।

এক থেকে দুই সপ্তাহের “উচ্চ তীব্রতার” যুদ্ধ?

আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, বর্তমান তীব্রতার যুদ্ধ সর্বোচ্চ এক থেকে দুই সপ্তাহ ধরে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। এরপর ওয়াশিংটনের সামনে দুটি পথ থাকবে।

প্রথমত, সংঘাতের তীব্রতা কমিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগোনো। দ্বিতীয়ত, আরও বড় ঝুঁকি ও খরচ মেনে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া। তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত কমে যেতে পারে, বাণিজ্য ও বিমান চলাচল ব্যাহত হতে পারে এবং বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়তে পারে।

স্থল অভিযান কি আসছে?

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে প্রয়োজন হলে স্থল অভিযানও চালানো হতে পারে। এই মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ট্রাম্পের সমর্থক “মাগা” (MAGA) ঘরানার অনেকেই বিদেশে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে থাকেন। তাদের অনেকেই এই যুদ্ধ নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানিয়েছেন।

ট্রাম্পের সমালোচনায় টাকার কার্লসন

মার্কিন রাজনৈতিক ভাষ্যকার টাকার কার্লসন, যিনি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত, তিনিও এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে তিনি হোয়াইট হাউস সফর করেছিলেন। তিনি ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে “ঘৃণ্য ও অশুভ” বলে মন্তব্য করেছেন। এই ধরনের সমালোচনা ট্রাম্পের রাজনৈতিক ঘাঁটির মধ্যেও বিভাজনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক সুযোগ

অন্যদিকে মার্কিন বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটরা এই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখছে। সাম্প্রতিক জনমত সমীক্ষা বলছে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে আমেরিকান জনগণের সমর্থন খুব সীমিত। এক রিপোর্টে দেখা গেছে, মাত্র ২৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন। অন্যদিকে সিএনএনের একটি সমীক্ষায় প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন।

এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে বড় ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে।

“মিশন অ্যাকমপ্লিশড” কৌশল?

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো স্বল্প সময়ের একটি শক্তিশালী সামরিক অভিযান চালিয়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও অবশিষ্ট পারমাণবিক অবকাঠামোর ক্ষতি ঘটানোর দাবি করবে। তারপর “মিশন সম্পন্ন” ঘোষণা করে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করবে। এই কৌশল ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময়কার “মিশন অ্যাকমপ্লিশড” ঘোষণার কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে দ্রুত সাফল্যের দাবি করেছিলেন। কিন্তু পরে সেই সংঘাত দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে পরিণত হয়েছিল।

দীর্ঘ যুদ্ধের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না

তবে সব বিশ্লেষকই মনে করেন না যে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে বাধ্য হবে। মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা এবং সামরিক বিশ্লেষক এডওয়ার্ড এরিকসনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক ক্ষমতা রাখে।

তিনি বলেন, “আমেরিকানরা অবশ্যই স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধ পছন্দ করে। কিন্তু ভিয়েতনাম, ইরাক এবং আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ যুদ্ধও চালিয়ে যেতে পারে।” তার মতে, যদি মার্কিন সেনাদের বড় ধরনের প্রাণহানি না ঘটে, তবে এই সংঘাত দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে।

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত অনিশ্চিত।
একদিকে রয়েছে দ্রুত সামরিক সাফল্য দেখিয়ে সংঘাতের ইতি টানার সম্ভাবনা, অন্যদিকে রয়েছে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের ঝুঁকি।

হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির চাপ—সবকিছু মিলিয়ে আগামী কয়েক সপ্তাহই নির্ধারণ করবে এই সংঘাত কোন দিকে এগোবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—এই যুদ্ধ কি সীমিত সামরিক অভিযানের মধ্যেই শেষ হবে, নাকি তা ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘ ও জটিল আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিণত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!