ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: শিশু-কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে লাগাম টানতে কর্ণাটক ও আন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ দেশের ডিজিটাল নীতিনির্ধারণে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কর্ণাটক সরকার ১৬ বছরের নিচে শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে আন্ধ্রপ্রদেশ সরকার ১৩ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্সেস বন্ধ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যা ভবিষ্যতে ১৬ বছর পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে।
দুই রাজ্যের সরকারেরই মূল যুক্তি এক—স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিশেষ করে স্বল্প দৈর্ঘ্যের ‘রিলস’ ভিডিওর প্রতি শিশুদের ক্রমবর্ধমান আসক্তি রোধ করা। শিক্ষাবিদ, অভিভাবক এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই এই বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে আসছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যালগরিদম-নির্ভর কনটেন্ট এবং তাৎক্ষণিক বিনোদনের কারণে শিশুদের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভরতা দ্রুত বাড়ছে। এর সঙ্গে উদ্বেগ, মনোযোগের ঘাটতি, ঘুমের সমস্যা এবং পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও যুক্ত হচ্ছে। অনেক স্কুলেই এখন অভিযোগ উঠছে, ডিজিটাল উদ্দীপনা ছাড়া ছাত্রছাত্রীরা ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না।
এই প্রসঙ্গে দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (AIIMS)-এর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. যাতন পাল সিং বালহারা বারবার সতর্ক করেছেন যে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রাখা যায়। তাঁর কথায়, শিশুদের মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা এখনও পুরোপুরি বিকশিত হয়নি, ফলে আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাব থাকায় তারা সহজেই এই আসক্তির ফাঁদে পড়ে। ডা. বালহারা AIIMS-এ একটি সাইবার ডি-অ্যাডিকশন ক্লিনিকও পরিচালনা করেন।
তবে প্রাথমিক প্রশংসার পরই সামনে এসেছে বাস্তবায়ন ও কার্যকারিতা নিয়ে নানা প্রশ্ন। ভারতের বর্তমান ব্যবস্থায় একটি মৌলিক অসঙ্গতি রয়েছে। আইন অনুযায়ী মোবাইল সিম কার্ড কেনার ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর হলেও বাস্তবে অনেক অপ্রাপ্তবয়স্কেরই ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর রয়েছে। অনেক সময় তারা অনানুষ্ঠানিক বা বেআইনি উপায়ে সিম পায়, আবার অনেকেই বাবা-মা বা আত্মীয়দের নামে নেওয়া সিম ব্যবহার করে।
এই পরিস্থিতিতে শুধু সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করলেই যে সমস্যার সমাধান হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বরং এর ফলে শিশুদের একাংশ আরও অনিয়ন্ত্রিত বা অচেনা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হল ওয়াই-ফাইয়ের ব্যাপক প্রসার। শহর ও আধা-শহরাঞ্চলে বাড়ির ব্রডব্যান্ড, স্কুলের নেটওয়ার্ক, পাবলিক ওয়াই-ফাই কিংবা বন্ধুদের মোবাইল হটস্পট—নানাভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার সম্ভব। ফলে বয়সের ভিত্তিতে এই অ্যাক্সেস নিয়ন্ত্রণ করা প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন।
নীতিনির্ধারকদের সামনে রয়েছে প্রজন্মগত বাস্তবতাও। কোভিড-১৯ লকডাউনের সময় স্কুলে যাওয়া বন্ধ থাকায় লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী অনলাইন ক্লাস, রেকর্ডেড লেকচার এবং ইউটিউবের শিক্ষামূলক ভিডিওর উপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। ফলে আজকের অনেক শিশুর কাছে স্মার্টফোন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, শিক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কি একটি পুরো প্রজন্মকে এই ডিজিটাল অভ্যাস থেকে দূরে রাখা সম্ভব? বিতর্কের আরেকটি দিক হল পরিচয় যাচাইকরণ। অতীতে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টকে আধার নম্বরের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব উঠেছিল, যাতে ব্যবহারকারীর বয়স ও পরিচয় নিশ্চিত করা যায়। সমর্থকদের মতে, এতে অপ্রাপ্তবয়স্কদের প্রবেশ সহজেই বন্ধ করা সম্ভব। কিন্তু গোপনীয়তা, নজরদারি এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের আশঙ্কা দেখিয়ে সেই প্রস্তাবের বিরোধিতা হয়েছিল এবং তা আর এগোয়নি।
এছাড়া অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, সোশ্যাল মিডিয়াকে পুরোপুরি ক্ষতিকর হিসেবে দেখাও ঠিক নয়। আজ বহু শিক্ষার্থী পড়াশোনার জটিল বিষয় বোঝার জন্য ইউটিউব বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের শিক্ষামূলক ভিডিওর উপর নির্ভর করে। ফলে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে শিক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সম্পদ থেকেও তারা বঞ্চিত হতে পারে। ইতিহাসও দেখিয়েছে যে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসক্তি নির্মূল করা যায় না। মাদকদ্রব্য নিষিদ্ধ হলেও বিশ্বের বহু সমাজে তার ব্যবহার থামেনি। অনেক সময় নিষেধাজ্ঞা সমস্যাকে আড়ালে ঠেলে দেয় মাত্র।
ফলে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, শিশুদের ডিজিটাল সুস্থতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন আরও সমন্বিত পদক্ষেপ। যেমন—দায়িত্বশীল ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া, অভিভাবক ও শিক্ষকদের সচেতন করা, এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিকে তাদের অ্যালগরিদমিক নকশার জন্য আরও জবাবদিহির আওতায় আনা।
কর্ণাটক ও আন্ধ্রপ্রদেশের পদক্ষেপ অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতা এখন জাতীয় পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। প্রযুক্তিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান না করে, সুরক্ষা, স্বাধীনতা ও সচেতন ব্যবহারের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াই এখন নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
