TOP NEWS

বাজেটের সমান লুট: ২০,০০০ কোটির ডাকাতি! তদন্তকারীদের রিপোর্টে সাইবার অপরাধের ভয়ংকর চিত্র

ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: কখনও কয়েক লাখ, কখনও আবার কয়েক কোটির ঝনঝনানি—তবে এই অর্থ কোনো লটারি বা পরিশ্রমের উপার্জন নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনভর জমানো পুঁজি। গত মাত্র এক বছরে দিল্লি অঞ্চল থেকেই প্রায় ১,২৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সাইবার প্রতারকরা। কিন্তু এই হিমশৈলের চূড়া মাত্র; সারা দেশে এই লুণ্ঠিত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০,০০০ কোটি টাকায়, যা ভারতের অনেক ছোট রাজ্যের বার্ষিক বাজেটের সমান। তদন্তকারীদের দেওয়া এই তথ্যটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, আমাদের স্মার্টফোন এবং ডিজিটাল লেনদেন এখন এক অদৃশ্য যুদ্ধের ময়দান হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে সামান্য অসচেতনতাই ডেকে আনছে সর্বনাশা আর্থিক বিপর্যয়।

গত সপ্তাহে দক্ষিণ দিল্লির গ্রেটার কৈলাশ এলাকায় এক প্রবীণ দম্পতির কাছ থেকে ১৪.৮৫ কোটি টাকা প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই ঘটনায় দম্পতি প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন এবং সাইবার অপরাধীরা কীভাবে সহজেই শিকারদের প্রভাবিত করতে পারে, তা দেখে এলাকাবাসী চমকে গেছে।

সরকারের জনসচেতনতামূলক প্রচার সত্ত্বেও অপরাধ কমেনি। ২০২৪ সালে দিল্লিতে সাইবার প্রতারকেরা — যারা অধিকাংশই কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও লাওস থেকে চীনা হ্যান্ডলারদের নির্দেশে কাজ করে — মোট প্রায় ১,১০০ কোটি টাকা চুরি করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ২০২৫ সালে সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১,২৫০ কোটি টাকায়। তবে স্বস্তির বিষয়, অর্থ উদ্ধারের হার ২০২৪ সালের ১০ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ২৪ শতাংশ হয়েছে।

৮১ বছরের ওম তানেজা এবং তার স্ত্রী ইন্দিরা তানেজাকে (৭৭) ১৬ দিন ধরে ‘ডিজিটাল গ্রেফতার’ করে প্রতারণা করা হয়েছে। ‘ডিজিটাল গ্রেফতার’ নামে পরিচিত এই পদ্ধতি গত তিন-চার বছর ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় নথিভুক্ত হওয়া নতুন ধরণের প্রতারণার অন্যতম। ওম তানেজা পিটিআই-কে বলেন, “আমাদের সারাজীবনের সঞ্চিত টাকা উঠে গেছে। প্রতারকরা বারবার আমাদের গ্রেফতার ও ভয়াবহ পরিণতির হুমকি দিয়েছে।” তিনি জানান, তার স্ত্রীকে হোয়াটসঅ্যাপে এক ব্যক্তি কল করেন। নিজেকে টেলিকম বিভাগের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে জানান, তার নম্বর অবৈধ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই নাটকীয়তা ও ভয় দেখিয়ে তারা আইন মানার প্রবণতা কাজে লাগিয়ে দম্পতিকে প্রতারণার জালে ফেলে। সূত্রের খবর, ২৪ ডিসেম্বর থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ‘ডিজিটাল গ্রেফতার’-এর আওতায় রেখে তারা দম্পতির সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্ট ও মিউচুয়াল ফান্ড ভেঙে মোট প্রায় ১৪.৮৫ কোটি টাকা বিভিন্ন হিসেবে ট্রান্সফার করিয়ে নেয়। এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ডিজিটাল গ্রেফতার ও ইনভেস্টমেন্ট প্রতারণা এখন সবচেয়ে বড় দু’টি সাইবার প্রতারণার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

তদন্তকারীদের মতে, প্রতারকদের বড় অংশ দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনামের “স্ক্যাম কম্পাউন্ড” থেকে পরিচালিত হয়, যেখানে চীনা হ্যান্ডলারদের নির্দেশে আন্তর্জাতিক শিকারদের টার্গেট করা হয়। এই কেন্দ্রগুলো থেকে ‘সিম বক্স’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক কল ভারতীয় নম্বর থেকে কল এসেছে বলে দেখানো হয়, ফলে সন্দেহ কমে এবং শিকার আতঙ্কিত হয়। এতে তদন্তও জটিল হয়।

পুলিশ জানায়, ‘মিউল অ্যাকাউন্ট’ বা ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে বহুপদে টাকা পাঠানো হয়। ভারতের কিছু প্রতারক বিদেশি সিন্ডিকেটকে এমন অ্যাকাউন্ট ও সিম দিতে সাহায্য করে। আর্থিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিরা কমিশনের বিনিময়ে নিজের অ্যাকাউন্ট প্রতারকদের কাছে তুলে দেয়। সাইবার অপরাধ রোধে পুলিশ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালাচ্ছে, বিশেষত প্রবীণ নাগরিকদের লক্ষ করে। সম্প্রতি ‘সান্তা কি শেখ’ নামে দুই পর্বের প্রচারাভিযানে নাগরিকদের অজানা কিউআর কোড স্ক্যানের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করা হয়।

এছাড়া ব্যাংকগুলির সঙ্গে সমন্বয় বৈঠক চালু রয়েছে। একটি ঘটনায় ভুয়া নথিতে অ্যাকাউন্ট খুলে প্রতারকদের টাকা পাচারে সাহায্য করার অভিযোগে দুই ব্যাংক কর্মীকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। পুলিশ নাগরিকদের আহ্বান জানায়, সাইবার প্রতারণার শিকার হলে জাতীয় হেল্পলাইন ১৯৩০ নম্বরে দ্রুত জানাতে। বলা হয়, দ্রুত অভিযোগ করলে লেনদেন আটকে দেওয়ার সুযোগ বাড়ে এবং টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। এক কর্মকর্তা জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লেনদেন ব্লক করা গেলে উদ্ধার সম্ভব হয়।

সাইবারপিসের প্রতিষ্ঠাতা ও গ্লোবাল প্রেসিডেন্ট মেজর বীনীত কুমার পিটিআই-কে বলেন, গত বছর পশ্চিমবঙ্গের এক স্থানীয় আদালত ডিজিটাল গ্রেফতার প্রতারণার মামলায় প্রথমবারের মতো নয় জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। তিনি বলেন, “আমাদের স্বীকার করতে হবে—ভারতে দীর্ঘদিন ধরেই সাইবার অপরাধে দণ্ডের হার কম। বহু ঘটনা রিপোর্টই হয় না। ফলে ভুক্তভোগীরা ভাবে—‘বলারই বা লাভ কী?’ কিন্তু আমি সবসময় বলি—আজ কম দণ্ড মানে কাল ন্যায়হীনতা নয়। ডিজিটাল প্রমাণ, ফোরেনসিক ও বিশেষ সাইবার ইউনিট দ্রুত উন্নত হচ্ছে। প্রতিটি অভিযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!