ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষমতার অলিন্দে দীর্ঘকাল ধরে শ্রীনগরের আধিপত্য থাকলেও, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বলছে পাশা উল্টে যেতে শুরু করেছে। মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহর আপাত ‘নরম’ অবস্থান এবং বিরোধী দল বিজেপির আগ্রাসী মেজাজে এখন জম্মু একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। এই পরিবর্তনের সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হলো কাটরার ‘শ্রী মাতা বৈষ্ণোদেবী ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল এক্সেলেন্স’ (SMVDIME)-এর স্বীকৃতি বাতিল।
আন্দোলন ও ধর্মীয় সংরক্ষণের দাবি
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ‘শ্রী মাতা বৈষ্ণোদেবী সংঘর্ষ সমিতি’ (বিজেপি ও আরএসএস পন্থী সংগঠনগুলোর জোট) একটি আন্দোলন শুরু করে। তাদের দাবি ছিল, এই মেডিকেল কলেজের ৫০টি আসনের সবকটিই হিন্দুদের জন্য সংরক্ষিত রাখতে হবে। মূলত এই প্রতিষ্ঠানে নিট (NEET)-এর মেধা তালিকায় জায়গা পাওয়া ৪২ জন কাশ্মীরি শিক্ষার্থীর ভর্তি ঘিরেই উত্তেজনার সূত্রপাত। হিন্দু গোষ্ঠীগুলোর যুক্তি ছিল, যেহেতু এই কলেজ শ্রী মাতা বৈষ্ণোদেবী শ্রাইন বোর্ডের অর্থায়নে চলে, তাই এখানে অন্য ধর্মের প্রবেশাধিকার থাকা উচিত নয়।
এনএমসি-র পরিদর্শন ও স্বীকৃতি বাতিল
এই আন্দোলনের মাঝেই গত ৬ জানুয়ারি ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশন (NMC) আকস্মিক পরিদর্শন চালিয়ে পরিকাঠামো ও শিক্ষক স্বল্পতার কারণ দেখিয়ে কলেজের এমবিবিএস (MBBS) পাঠ্যক্রমের অনুমোদন বাতিল করে দেয়। অথচ গত বছর সেপ্টেম্বরেই এই প্রতিষ্ঠানটি এনএমসি-র ছাড়পত্র পেয়েছিল।
সরকার ও বিরোধীদের বাগযুদ্ধ
অনুমোদন বাতিলের পর মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ গত ৭ জানুয়ারি ঘোষণা করেন যে, বর্তমানে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অন্যান্য মেডিকেল কলেজে স্থানান্তরিত করা হবে। ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বলেন, “মানুষ একটি মেডিকেল কলেজ খোলার জন্য লড়াই করে, আর এখানে একটি কলেজ বন্ধ করার জন্য লড়াই হলো। আপনারা ধর্মের ভিত্তিতে কলেজটি বন্ধ করলেন।” তিনি কলেজের আচার্য তথা উপ-রাজ্যপাল মনোজ সিনহার দপ্তরের দিকেও আঙুল তোলেন।
অন্যদিকে, বিধানসভার বিরোধী দলনেতা সুনীল কুমার শর্মা এই সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর দাবি, “বৈষ্ণোদেবী মন্দিরের ভক্তদের দান করা অর্থ বেদ চর্চা বা বৈদিক গবেষণার কাজে ব্যবহার করা উচিত। আমরা সেখানে একটি গুরুকুল দেখতে চেয়েছিলাম।”
ক্ষমতার ভারসাম্যে বদল
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জম্মু অঞ্চলে বিজেপির বিপুল জনসমর্থন এখন নীতি নির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলছে। শুধু এই মেডিকেল কলেজ নয়, উর্দু ভাষার বাধ্যবাধকতা নিয়ে বিতর্ক বা সন্তোষ ট্রফিতে খেলোয়াড় নির্বাচন নিয়ে প্রতিবাদের মুখেও আবদুল্লাহ সরকারকে পিছু হটতে দেখা গেছে।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে একে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, শিক্ষার ক্ষেত্রে এই ধরণের মেরুকরণ ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। আপাতত ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিশাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ এবং সেখানে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন—উভয়ই এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
