ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ভারতের জ্বালানি বাজারে। বিশেষ করে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি (LPG) সরবরাহ ও দামে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দেশের কোটি কোটি পরিবারের রান্নার জ্বালানি এবং রেস্তোরাঁ শিল্পের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত এলপিজি এখন তুলনামূলকভাবে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে মূল্যবৃদ্ধিও।
এলপিজির দাম বৃদ্ধি
এনডিটিভির এক প্রতিবদেনে বলা হয়েছে, গত ৭ মার্চ সরকার গৃহস্থালি এলপিজির দাম এক ধাক্কায় ৬০ টাকা বাড়িয়েছে। ফলে দিল্লিতে ১৪.২ কেজির একটি নন-সাবসিডাইজড সিলিন্ডারের দাম দাঁড়িয়েছে ৯১৩ টাকা। একই দিনে বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য ১৯ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দামও প্রায় ১১৪–১১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে, যার ফলে দিল্লিতে এই সিলিন্ডারের দাম বেড়ে হয়েছে প্রায় ১,৮৮৩ টাকা। দামের পাশাপাশি সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন বড় শহরে বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের ঘাটতির খবর মিলছে। এই পরিস্থিতিতে ন্যাশনাল রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া (NRAI) কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীর কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছে। সংগঠনের অভিযোগ, এলপিজি সরবরাহ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক একটি সরকারি নির্দেশের ফলে দেশের রেস্তোরাঁ শিল্পে রান্নার গ্যাসের প্রাপ্যতা বিঘ্নিত হতে পারে।
কেন চাপে ভারত?
ভারতে এলপিজির চাহিদার বড় অংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। মোট এলপিজি ব্যবহারের প্রায় ৬০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি থেকে—যেমন কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, সৌদি আরব এবং কুয়েত। বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ সরবরাহের পথ নিয়ে অনিশ্চয়তা। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ এলপিজি জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। যুদ্ধঝুঁকির বিমা খরচ বেড়ে যাওয়া, জাহাজের রুট পরিবর্তন এবং পরিবহন সময় বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে এলপিজি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।
ভারতে এলপিজি ব্যবহারের বৃদ্ধি
গত এক দশকে ভারতে এলপিজি ব্যবহারের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬–১৭ অর্থবছরে দেশে এলপিজি ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ২১.৬১ মিলিয়ন টন। তা বেড়ে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৩১.৩২ মিলিয়ন টনে পৌঁছায়। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে তা সামান্য কমে দাঁড়ায় ৩০.৮৬ মিলিয়ন টন। এই হিসাবে দেখা যায়, গত দশ বছরে ভারতে এলপিজি ব্যবহারে প্রায় ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। রান্নার গ্যাস হিসেবে এলপিজির ওপর পরিবারের নির্ভরতা বাড়ার কারণেই এই বৃদ্ধি।
দামের ওঠানামা
এনডিটিভির প্রতিবদেন অনুযায়ী, এলপিজির দামও গত এক দশকে বারবার ওঠানামা করেছে। দিল্লিকে মানদণ্ড হিসেবে ধরলে, ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে একটি গৃহস্থালি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ৬৫৮ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে ৯১৩ টাকায় পৌঁছেছে। এই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ দাম হয়েছিল ২০২৩ সালের মার্চ মাসে, যখন একটি সিলিন্ডারের দাম দাঁড়িয়েছিল ১,১০৩ টাকা। পরে ২০২৪ সালে তা কমে ৮০৩ টাকায় নেমে আসে। কিন্তু ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের শুরুতে আবারও দাম বাড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যা এবং সরকারের মূল্য নির্ধারণ নীতির পরিবর্তন—সব মিলিয়ে এই ওঠানামা দেখা যাচ্ছে।
বিশ্বে তেলের সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী কারা?
২০২৩ সালের হিসাবে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রে, যা বিশ্বব্যাপী মোট ব্যবহারের প্রায় ১৯.৯ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চীন (১৫.৯ শতাংশ) এবং তৃতীয় স্থানে ভারত (৫.২ শতাংশ)। এছাড়া রাশিয়া ৩.৮ শতাংশ, সৌদি আরব ৩.৫ শতাংশ, জাপান ৩.২ শতাংশ এবং ব্রাজিল ৩.১ শতাংশ তেলজাত পণ্য ব্যবহার করে। কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইরান—এই তিনটি দেশ প্রত্যেকেই প্রায় ২.৪ শতাংশ করে ব্যবহার করে। এই শীর্ষ দশটি দেশ মিলিয়ে বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ৬২ শতাংশ ব্যবহার করে।
পরিবহন খাতেই তেলের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার
বিশ্বে মোট অপরিশোধিত তেলের ব্যবহার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় অংশ ব্যবহৃত হয় পরিবহন খাতে। ২০২৩ সালে ডিজেল ও গ্যাস তেলের ব্যবহার ছিল মোটের ৩১.৯ শতাংশ। মোটর গ্যাসোলিন বা পেট্রোলের অংশ ছিল ২৭.২ শতাংশ। অর্থাৎ এই দুটি জ্বালানিই বিশ্বব্যাপী তেলের অর্ধেকের বেশি ব্যবহার দখল করে রেখেছে। এছাড়া এলপিজি ও ইথেনের অংশ প্রায় ১০ শতাংশ, জেট কেরোসিন ৭.৭ শতাংশ এবং ন্যাফথা ৬.৭ শতাংশ। জাহাজ ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফুয়েল অয়েলের অংশ ৬.২ শতাংশ। অন্যান্য বিভিন্ন তেলজাত পণ্যের অংশ মিলিয়ে রয়েছে আরও প্রায় ৯.৫ শতাংশ।
সামনে কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ভারতের এলপিজি সরবরাহ এবং দাম—দুটিই আরও চাপের মুখে পড়তে পারে। বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়ানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করা এখন ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ এবং রেস্তোরাঁ শিল্প—উভয়ের ওপরই এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে আগামী মাসগুলিতে।
