ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: ভারতের বিশাল জনসংখ্যার ক্ষেত্রে টাইপ ২ ডায়াবেটিস নির্ণয় এবং পর্যবেক্ষণের জন্য বহুল প্রচলিত ‘গ্লাইকেটেড হিমোগ্লোবিন’ (HbA1c) পরীক্ষার নির্ভুলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে একটি নতুন গবেষণাপত্র। ‘দ্য ল্যানসেট রিজিওনাল হেলথ – সাউথইস্ট এশিয়া’-তে প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, রক্তাল্পতা (Anaemia), হিমোগ্লোবিনোপ্যাথি এবং গ্লুকোজ-৬-ফসফেট ডিহাইড্রোজেনেজ (G6PD) ঘাটতির মতো রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে HbA1c পরীক্ষার ফলাফল ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
কেন HbA1c সঠিক তথ্য দিচ্ছে না?
গবেষণার প্রধান লেখক অধ্যাপক অনুপ মিশ্র এবং তাঁর সহযোগীরা জানিয়েছেন, HbA1c পরীক্ষার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের রক্তে গ্লুকোজের গড় মাত্রা পরিমাপ করা হয়। কিন্তু রক্তকণিকার আয়ুষ্কাল, গঠন বা হিমোগ্লোবিনের পরিমাণের ওপর প্রভাব ফেলে এমন কোনো রোগ থাকলে HbA1c-এর ফলাফল বিভ্রান্তিকর হতে পারে। এর ফলে ডায়াবেটিস নির্ণয়ে ভুল বা ভুল চিকিৎসা হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ভারতে, বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা জনগোষ্ঠীর মধ্যে আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তাল্পতা খুব সাধারণ, যা HbA1c-এর মানকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে।
ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি
ফোর্টিস সি-ডক সেন্টার অফ এক্সিলেন্স ফর ডায়াবেটিস-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিশ্র সতর্ক করেছেন যে, শুধুমাত্র HbA1c পরীক্ষার ওপর নির্ভর করলে ডায়াবেটিস পরিস্থিতি ভুলভাবে শ্রেণীবদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এর ফলে সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় না হওয়া বা ভুল চিকিৎসার কারণে রোগীদের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। সহ-লেখক শশাঙ্ক জোশী জানিয়েছেন, উন্নত শহরের হাসপাতালগুলোতেও লোহিত রক্তকণিকার ভিন্নতা এবং বংশগত রক্তজনিত ব্যাধির কারণে HbA1c-এর ফলাফলে অসঙ্গতি দেখা গেছে। গ্রামীণ ও আদিবাসী অঞ্চলে যেখানে রক্তাল্পতার প্রকোপ বেশি, সেখানে এই অসঙ্গতি আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নতুন সুপারিশ ও রোগ নির্ণয় পদ্ধতি
এই সমস্যার সমাধানে বিশেষজ্ঞরা ভারতের জন্য একটি নতুন রোগ নির্ণয় ও পর্যবেক্ষণ কাঠামো প্রস্তাব করেছেন:
স্বল্প সম্পদযুক্ত এলাকা (Low-resource settings): এখানে ডায়াবেটিস নির্ণয়ের জন্য ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (OGTT)—অর্থাৎ খালি পেটে এবং গ্লুকোজ খাওয়ার দু’ঘণ্টা পর রক্তের শর্করা মাপার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পর্যবেক্ষণের জন্য সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার বাড়িতেই রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা (Self-monitoring of blood glucose) এবং হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।
উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্র (Tertiary care settings): এখানে HbA1c পরীক্ষার পাশাপাশি ডায়াবেটিস নির্ণয়ের জন্য OGTT ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। পর্যবেক্ষণের জন্য কন্টিনিউয়াস গ্লুকোজ মনিটরিং এবং ফ্রুক্টসামিনের মতো অন্যান্য বায়োকেমিক্যাল মার্কার ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
গবেষণায় উপসংহারে বলা হয়েছে, HbA1c একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলেও, লোহিত রক্তকণিকার ব্যাধি বেশি থাকা জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র এর ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। স্থানীয় স্বাস্থ্যের বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে রোগ নির্ণয়ের কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন। এই ভিডিওটি HbA1c টেস্ট এবং ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্টের (OGTT) মধ্যে পার্থক্য এবং কোন পরিস্থিতিতে কোনটি বেশি নির্ভরযোগ্য সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করে।
HbA1c এর ত্রুটি এবং সমাধানের পথ
উপরোক্ত গবেষণার প্রেক্ষাপটে, কেন HbA1c ভারতের প্রেক্ষাপটে পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়, তা বোঝার জন্য আমাদের এই পরীক্ষার কার্যপদ্ধতি এবং ভারতীয়দের মধ্যে প্রচলিত স্বাস্থ্যগত সমস্যাগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে।
HbA1c কীভাবে কাজ করে?
রক্তে যখন গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়, তখন তা লোহিত রক্তকণিকায় উপস্থিত হিমোগ্লোবিনের সাথে মিশে যায়। এই প্রক্রিয়াটিকে ‘গ্লাইকেশন’ বলা হয়। HbA1c টেস্টটি গত ২-৩ মাসের গড় রক্তে শর্করার মাত্রা নির্দেশ করে। চিকিৎসকরা সাধারণত ধরে নেন যে, হিমোগ্লোবিনের গড় আয়ু ১২০ দিন, তাই এই পরীক্ষার ফল নির্ভরযোগ্য।
ভারতীয় প্রেক্ষাপটে ত্রুটির কারণ
গবেষকরা চিহ্নিত করেছেন যে, ভারতের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ লোহিত রক্তকণিকার বিভিন্ন ব্যাধিতে আক্রান্ত, যা HbA1c এর ফলাফলকে ভুল দিকে পরিচালিত করে:
রক্তাল্পতা (Iron-deficiency Anaemia): ভারতে অপুষ্টিজনিত কারণে আয়রনের ঘাটতি খুব সাধারণ, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের মধ্যে। আয়রনের অভাবে লোহিত রক্তকণিকা ছোট হয়ে যায় বা এদের আয়ু কমে যায়। এতে HbA1c এর রিডিং প্রকৃত গড় গ্লুকোজের চেয়ে কম বা বেশি দেখাতে পারে।
হিমোগ্লোবিনোপ্যাথি (Haemoglobinopathies): যেমন থ্যালাসেমিয়া বা সিকল সেল অ্যানিমিয়া। এই বংশগত রোগগুলোতে হিমোগ্লোবিনের গঠন অস্বাভাবিক হয়, যা HbA1c পরিমাপে বাধা দেয়।
G6PD ঘাটতি: এটি একটি এনজাইমের ঘাটতি যা লোহিত রক্তকণিকাগুলোকে দ্রুত ভেঙে ফেলার কারণ হতে পারে।
ক্লিনিক্যাল প্রভাব: ভুল ডায়াগনোসিস
অধ্যাপক অনুপ মিশ্রের মতে, এই ত্রুটির কারণে রোগীকে সুস্থ মনে হলেও আসলে তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত থাকতে পারেন, অথবা ডায়াবেটিস না থাকা সত্ত্বেও তাকে ভুল ওষুধ দেওয়া হতে পারে।
ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (OGTT): এটি একটি সুনির্দিষ্ট পরীক্ষা যা সরাসরি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করে, হিমোগ্লোবিনের অবস্থার ওপর নির্ভর করে না। এটিই এখন ডায়াবেটিস নির্ণয়ে সোনার মানদণ্ড (Gold Standard) হওয়া উচিত।
হিমোগ্লোবিন পরীক্ষা: HbA1c পরীক্ষা করার আগে রোগীর রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। গবেষকরা বলেছেন, শুধুমাত্র HbA1c এর ওপর নির্ভর না করে, রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা এবং স্থানীয় রোগ ব্যাধির প্রকোপের কথা মাথায় রেখেই চিকিৎসকদের ডায়াবেটিস নির্ণয় ও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
