TOP NEWS

এসআইআর সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়: বড়সড় প্রশ্ন তুললেন খোদ প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার

(Former CEC SY Quraishi || File Photo)

INTERVIEW

—————————————

দেশের বেশ কয়েকটি রাজ্য ও কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) শুরু করেছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। বিশেষ এই কর্মসূচি নিয়ে ধেড় বিতর্ক হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এসআইআর কর্মসূচি নিয়ে এবার সুর চড়ালেন এস ওয়াই কুরেশি। চলমান বিশেষ নিবিড় সংশোধন (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন—SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন দেশের প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। গোটা এই প্রক্রিয়াকে অপ্রয়োজনীয়, মাত্রাতিরিক্ত এবং প্রক্রিয়াগত ত্রুটিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। এক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কুরেশি বলেন, এই এসআইআর-এর ফলে সঠিক ভোটার তালিকা গঠনে গত কয়েক দশকের পরিশ্রম ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।

বিশেষ সাক্ষাৎকারে আর কি কি বলেছেন প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার?

ভোটাধিকার খর্ব করার আশঙ্কা

এসআইআর-এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। তাঁর কথায়, এই প্রক্রিয়ায় এখন প্রশাসনের উপরই নির্ভুলতা প্রমাণের দায় এসে পড়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা নাগরিকদের ভোটাধিকার খর্ব করার আশঙ্কা তৈরি করছে।

এসআইআর ঘিরে ভোটার বঞ্চনা ও প্রশাসনিক অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষিতে কুরেশি স্পষ্ট করে জানান, কেন তিনি এই প্রক্রিয়াকে অপ্রয়োজনীয়, ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রক্রিয়াগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাঁর আশঙ্কা, এই ধরনের উদ্যোগ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার উপর সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করতে পারে।

পুরোনো ব্যবস্থাকে ডাস্টবিনে ফেলা হচ্ছে

প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জানিয়েছেন, বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়ার কোনও প্রয়োজনই ছিল না। তাঁর দাবি, গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নিয়মিতভাবে অনুসৃত সামারি রিভিশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভারতের ভোটার তালিকা ইতিমধ্যেই অত্যন্ত নির্ভুল হয়ে উঠেছে। কুরেশি বলেন, “গত ২০–২৫ বছর ধরে যে সামারি রিভিশন চালু ছিল, তা খুব ভালো কাজ করেছে। আমরা ভোটার তালিকায় প্রায় ৯৯ শতাংশ নির্ভুলতা অর্জন করতে পেরেছিলাম। সেই জায়গায় এসআইআর সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়।”

তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল ব্যবস্থার ফলে ভোটার তালিকা নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে আপডেট করা সম্ভব হচ্ছিল। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার উপর ভরসা না রেখে নতুন করে পুরো প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত তিনি বোধগম্য বলে মনে করেন না। কুরেশির ভাষায়, “বিদ্যমান ভোটার তালিকাকে আরও শক্তিশালী করার বদলে, সেগুলিকে কার্যত ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আবার ঘরে ঘরে গিয়ে নতুন করে ভোটার খোঁজা হচ্ছে। যে ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমাদের ৩০ বছর লেগেছে, তারা ভাবছে তা ৩০ দিনে করা সম্ভব। এটি একটি মারাত্মক ভুল।”

ভোটার তালিকা ‘পরিষ্কার’-এ উল্টো ফল

সরকারের দাবি, বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য ভোটার তালিকা পরিষ্কার বা ত্রুটিমুক্ত ও স্বচ্ছ করা। তবে এই দাবির জবাবে প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সতর্ক করে বলেছেন, এর ফল উল্টোও হতে পারে। কুরেশির মন্তব্য, “ভোটার তালিকা পরিষ্কার করার বদলে শেষ পর্যন্ত আরও অপরিষ্কার তালিকা তৈরি হতে পারে।” তাঁর মতে, ‘ইনটেনসিভ রিভিশন’ (নিবিড় সংশোধন) শব্দবন্ধটাই বিভ্রান্তিকর। তিনি বলেন, “যে কোনও সংশোধন মানে হল বিদ্যমান কোনও কিছুকে ঠিক করা। কিন্তু এখানে যা করা হচ্ছে, তা হল বিদ্যমান নথিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে একেবারে শূন্য থেকে তথ্য সংগ্রহ করা। এটি অত্যন্ত কঠিন কাজ। তারা যেন নিজেরাই বোলতা পোকায় হাত ঢুকিয়েছে। এর পরিণতি এখন স্পষ্ট—সারা দেশ অস্থির হয়ে উঠেছে।”

অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও প্রশ্নবিদ্ধ

বিহারের উদাহরণ তুলে ধরে কুরেশির প্রশ্ন, বিদেশি শনাক্ত করার যে লক্ষ্য দেখানো হচ্ছে, তার তুলনায় এই প্রক্রিয়ার পরিসর কতটা যুক্তিসংগত। তিনি বলেন, “বিহারে প্রায় ৫০০ জন বিদেশি শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আনুমানিক ১৫০ জন বাংলাদেশি এবং ৩৫০ জন নেপালি হিন্দু নারী। অথচ এর জন্য প্রায় ৮ কোটি বিহারবাসীকে দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে। এবার ভাবুন, জাতীয় স্তরে এর প্রভাব কী হবে। দেশে প্রায় ১০০ কোটি ভোটার রয়েছে।” তাঁর মতে, এই পদ্ধতি “সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ”।

পুরনো ব্যবস্থার সঙ্গে কোনও মিল নেই

প্রাক্তন সিইসি আরও বলেন, বর্তমানে যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে, তা গত বহু বছর ধরে সফলভাবে চালু থাকা ব্যবস্থার সঙ্গে কোনওভাবেই মেলে না। কুরেশির ভাষায়, “গত ২০ বছর ধরে আমরা যে ব্যবস্থা অনুসরণ করেছি, এখনকার প্রক্রিয়া তা নয়।” তিনি ব্যাখ্যা করেন, সামারি রিভিশনের মাধ্যমে প্রতি বছরই নতুন ভোটার যুক্ত করা এবং ASD (অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত ও মৃত) ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া কার্যকরভাবে সম্পন্ন হত।কুরেশি বলেন, “এই আপডেটের ব্যবস্থা অত্যন্ত ভালোভাবে কাজ করছিল। হঠাৎ করে বলা হচ্ছে, সেই পুরো ব্যবস্থাকে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আবার নতুন করে শুরু করা হবে। ঠিক আছে, আপনাদের জন্য শুভকামনা”—এই ভাষাতেই তিনি তীব্র সমালোচনা করেন।

দায়বদ্ধতা নির্ধারণ জরুরি

বিশাল আকারের এই প্রক্রিয়ায় ভুল হলে তার পরিণতি মারাত্মক হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশি। তাঁর কথায়, “যদি এর ফলে একটি পরিষ্কার ভোটার তালিকা তৈরি না হয় এবং যদি মানুষকে ভুল করে মৃত ঘোষণা করার মতো ঘটনাসহ নানা অবিচার সামনে আসে, তবে কারও না কারও দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করতেই হবে।”

সততা নয়, প্রশ্নের মুখে বিচক্ষণতা

নির্বাচন কমিশনের সততা নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছে কি না—এই প্রসঙ্গে কুরেশি প্রতিষ্ঠানটির পক্ষেই সওয়াল করেন। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রজ্ঞা বা বিচক্ষণতা নিয়ে তাঁর গুরুতর আপত্তি রয়েছে। তিনি বলেন, “আমি নির্বাচন কমিশনের সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলছি না, কিন্তু আমি অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের বিচক্ষণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলব।”

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে মন্তব্য নয়

এই বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তরে কুরেশি সাফ জানিয়েছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে কোনও মন্তব্য করবেন না তিনি। কুরেশি স্পষ্ট করে বলেন, “আমি এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে পারি না। এর পেছনে কী উদ্দেশ্য রয়েছে, তা আমার জানা নেই। আমি শুধুমাত্র পদ্ধতি এবং প্রক্রিয়া নিয়েই কথা বলছি।”

সৌজন্যে: দ্য ফেডারেল || বাংলা অনুবাদ: সুরাইয়া সুমি সরকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!