ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন বলে রবিবার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। শনিবার রাতে ইরানের বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনা ও সামরিক অবকাঠামোর ওপর কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিমান হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় খামেনি সহ ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের একাধিক সদস্য নিহত হয়েছেন বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবদেনে বলা হয়েছে, লক্ষ্যভেদী হামলার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে খামেনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, “ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে আমরা সেই ব্যক্তিকে লক্ষ্য করেছি, যিনি ১৯৮৯ সাল থেকে ইরানকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন।” ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী জানান, খামেনির আবাসিক কমপ্লেক্স সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে। ইরানি সূত্রগুলো বলছে, হামলায় দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদে, বিপ্লবী গার্ডসের প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর এবং শীর্ষ উপদেষ্টা আলি শামখানি নিহত হয়েছেন।
তেহরানে আতঙ্ক ও উল্লাস—দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়া
খামেনির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানী তেহরান, কারাজ ও ইসফাহানে কিছু মানুষ রাস্তায় নেমে উদযাপন করেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে আতশবাজি ও স্লোগান দিতে দেখা গেছে। তবে একইসঙ্গে দেশজুড়ে ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। উত্তরাঞ্চলীয় তাবরিজ শহরের ৩২ বছর বয়সী এক নারী মিনু ফোনে বলেন, “আমরা ভীষণ আতঙ্কে আছি। আমার বাচ্চারা কাঁপছে। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই—আমরা এখানেই মারা যাব।” বিমান হামলার বিস্ফোরণে বহু শহরে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় ৮৫ জন নিহত হওয়ার দাবি করেছে স্থানীয় প্রসিকিউটর। এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ইরানের পাল্টা হামলা: উপসাগরীয় অঞ্চল জ্বলছে
হামলার জবাবে ইরান শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। ইসরায়েলের তেল আবিবে একটি আবাসিক ভবনে আঘাতে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন বলে দেশটির জরুরি পরিষেবা জানিয়েছে।
ইরান শুধু ইসরায়েলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি—সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ও দুবাই, কাতারের দোহা, কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতেও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। দুবাইয়ের একটি বিমানবন্দর টার্মিনাল ও বিলাসবহুল হোটেল এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সাপোর্ট সেন্টারের কাছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে ভিডিও ফুটেজে। কাতার জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় ঢোকা সব ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনে প্রতিশোধের অধিকার তারা রাখে। কুয়েতও মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার কথা নিশ্চিত করেছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ডসের এক কমান্ডার ইব্রাহিম জাব্বারি বলেছেন, “এখন পর্যন্ত আমরা কেবল পুরোনো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছি—অদূর ভবিষ্যতে আমরা এমন অস্ত্র দেখাব, যা বিশ্ব আগে দেখেনি।”
ট্রাম্পের বার্তা: “ইরানিদের সরকার উৎখাত করতে হবে”
শনিবার ভোরে সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প বলেন, “এই সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানি শাসনের আসন্ন হুমকি নির্মূল করা।” তিনি ইরানের জনগণকে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “এটি হয়তো প্রজন্মের মধ্যে একমাত্র সুযোগ—দেশ আপনাদেরই।” ট্রাম্প আরও সতর্ক করে বলেন, “প্রয়োজনে সপ্তাহজুড়ে নির্ভুল ও ব্যাপক বোমাবর্ষণ চলবে—মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত।”
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, অভিযানের কোডনাম ছিল “অপারেশন এপিক ফিউরি।” গোয়েন্দা ও ট্র্যাকিং সিস্টেমের মাধ্যমে খামেনেইয়ের অবস্থান নজরদারি করা হয়েছিল।
পারমাণবিক উত্তেজনা ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিল, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র সক্ষমতা অর্জনের পথে এগোচ্ছে। ইরান অবশ্য বলেছে, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি কেবল জ্বালানি উৎপাদনের জন্য। হামলার ঠিক আগের দিন পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা চলছিল বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান। তবে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ত্যাগে রাজি না হওয়ায় আলোচনা ভেঙে যায়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে রাশিয়া ও চীন হামলার তীব্র সমালোচনা করেছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত বলেছেন, “আলোচনার সময় ইরানকে পেছন থেকে ছুরি মারা হয়েছে।” জাতিসংঘ মহাসচিব অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন।
তেলবাজারে ধাক্কা, হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি
ইরান সতর্ক করেছে, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা হয়েছে। বিশ্ব তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। জ্বালানি বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি অবনতি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১০–২০ ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বিমান চলাচলও বিপর্যস্ত হয়েছে—বহু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক চাপ
ট্রাম্প প্রশাসনের এই সামরিক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ডেমোক্র্যাট ও কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা বলেছেন, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান সংবিধানবিরোধী। কয়েক দিনের মধ্যে কংগ্রেসে ভোটের দাবি উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়া শুধু শাসন কাঠামো নয়—সমগ্র আঞ্চলিক ভারসাম্যকে নাড়িয়ে দিতে পারে। ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো ইতিমধ্যে দুর্বল হলেও প্রতিশোধমূলক হামলা আরও বাড়তে পারে।
ইসরায়েল জানিয়েছে, প্রায় ২০০ যুদ্ধবিমান ৫০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে—এটি তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আকাশ অভিযান। পরিস্থিতি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একদিকে নেতৃত্বহীন ইরান, অন্যদিকে প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি—এই দ্বন্দ্ব মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার ও বিশ্ব রাজনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
অনিশ্চয়তার মুখে ইরান ও বিশ্ব
খামেনির মৃত্যুর খবর সত্য হলে ইরানে ক্ষমতার উত্তরাধিকার প্রশ্নে সংকট তৈরি হবে। ধর্মীয়-রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকা সর্বোচ্চ নেতার পদ এখন শূন্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে হয়তো অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই, গণবিক্ষোভ বা সামরিক নিয়ন্ত্রণ—যেকোনো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাতের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বহু শহরে সাইরেন, বিস্ফোরণ ও আতঙ্ক—এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন নজর রাখছে এক অস্থির ও বিপজ্জনক সংকটের দিকে। ইরানের এক বাসিন্দার কথায়, “আজ আমরা জানি না আগামীকাল আমাদের দেশ থাকবে, না যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে যাবে।”
