ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পথে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। প্রায় ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফেরা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই নির্বাচনে ঢাকা-১৭ এবং বগুড়া-৬ আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন, যা তাঁকে আগামীতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বেসরকারি ফলাফল এবং দলীয় সূত্রের তথ্যানুযায়ী, বিএনপি একাই দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হওয়ার পথে রয়েছে। এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর পর বিএনপি আবারো রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরতে যাচ্ছে।
নরেন্দ্র মোদি ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিনন্দন
ভোটের পরদিন শুক্রবারই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের এই নির্বাচনী ফলাফলকে স্বাগত জানিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমান ও বিএনপিকে অভিনন্দন জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ এক পোস্টে লেখেন, “বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনে বিএনপিকে নিরঙ্কুশ বিজয়ের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য জনাব তারেক রহমানকে আমি আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি।”
মোদি তার পোস্টে আরও উল্লেখ করেন, “এই বিজয় বাংলাদেশের জনগণের আপনার নেতৃত্বের ওপর আস্থার প্রতিফলন।” ভারতের প্রধানমন্ত্রী আগামীতে তারেক রহমানের সাথে কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, “আমি আমাদের বহুমুখী সম্পর্ক জোরদার করতে এবং সাধারণ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে আপনার সাথে কাজ করার অপেক্ষায় আছি।” মোদি ভারত কর্তৃক “একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশকে” সমর্থন অব্যাহত রাখার আশ্বাসও দিয়েছেন।
একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেনও তারেক রহমানকে “ঐতিহাসিক বিজয়ের” জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। এক্স-এ দেওয়া বার্তায় তিনি বলেন, “সফল নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশের জনগণকে এবং ঐতিহাসিক বিজয়ের জন্য বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও তারেক রহমানকে অভিনন্দন। সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার লক্ষ্য অর্জনে আপনাদের সাথে কাজ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র উন্মুখ।”
নির্বাচনী চিত্র ও বিএনপির বিজয়ের ধারা
এবার বিএনপি নির্বাচনে এককভাবে ২৯২টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে এবং বাকি আসনগুলো ছোট শরিক দলের জন্য ছেড়ে দিয়েছিল। বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বিএনপি অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হওয়ার পথে রয়েছে। দলীয় মুখপাত্র রুহুল কবির রিজভী এক বিবৃতিতে এই “ঝাড়ুদার বিজয়ের” দাবি করে কর্মীদের রাজপথে বিজয়োল্লাস না করে শুক্রবার জুমার নামাজের পর শুকরিয়া আদায়ের আহ্বান জানিয়েছেন।
কে এই তারেক রহমান?
৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র। মায়ের মৃত্যুর পর দেশে ফিরে তিনি দলের হাল ধরেন এবং আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
ডিসেম্বর ২০২৫-এ খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দল পরিচালনা করছিলেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সময় তাকে “ছায়া প্রধানমন্ত্রী” হিসেবে গণ্য করা হতো, তখন তিনি হাওয়া ভবন থেকে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।
রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও নির্বাসন
২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতার পর সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে তারেক রহমান গ্রেফতার হন। দীর্ঘ ১৮ মাস কারাভোগের পর চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডনে যান এবং সেখানে দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে কাটান। তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা ছিল, যা শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাতিল করা হয়েছে।
ভারতের সাথে সম্পর্ক ও তারেক রহমানের ‘রিসেট’ নীতি
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভারতের সাথে নতুন সম্পর্কের সমীকরণ তৈরি করা। শেখ হাসিনার আমলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সুবর্ণ সময় পার করলেও, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে সেই সম্পর্কে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে।
তারেক রহমান ভারতের সাথে বিদ্যমান “সমস্যাগুলো” স্বীকার করেছেন এবং গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি ভারতের সাথে “পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার সম্পর্ক” চান। হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এটি নির্ভর করছে ভারতের ওপরও।”
নতুন BNP-led সরকারের জন্য ভারতের সাথে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা হবে প্রথম বড় পরীক্ষা, কারণ হাসিনা সরকারের পতনের পর সম্পর্ক তিক্ততায় রূপ নিয়েছে। তবে মোদির অভিনন্দন বার্তা দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
