ডেইলি ডোমকল, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ‘চাণক্য’ হিসেবে পরিচিত তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতা সোমবার ভোরে দীর্ঘ অসুস্থতার পর প্রয়াত হয়েছেন। ১৯৫৪ সালে উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচড়াপাড়ায় জন্ম নেওয়া এই সংগঠক-নেতা ছিলেন পোস্ট-লেফট যুগের পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতির অন্যতম স্তরবহুল চরিত্র।
শুরুর পথ: যুব কংগ্রেস থেকে তৃণমূল
আশির দশকে যুব কংগ্রেসের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবনের সূচনা করেন মুকুল রায়। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করলে প্রথম সারির যে ক’জন নেতা তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন রায়। বক্তৃতা বা জনসমাবেশের চেয়ে সংগঠন, সমীকরণ ও নির্বাচনী গণিত ছিল তাঁর শক্তি। বুথ কমিটি গঠন, জেলা-সমীকরণ, প্রার্থী নির্বাচন এবং জোট-ব্যবস্থাপনা—এই সূক্ষ্ম সাংগঠনিক কাজেই তিনি দ্রুত উঠে আসেন দলের কেন্দ্রীয় স্তরে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও দিল্লিতে দলের প্রধান সমন্বয়ক হয়ে ওঠেন।
২০০৬ সালে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হয়ে পরে পুনর্নির্বাচিত হন তিনি। ২০০৯ সালে তৃণমূলের রাজ্যসভার দলনেতা হন। ইউপিএ-২ সরকারের আমলে প্রথমে জাহাজ প্রতিমন্ত্রী এবং ২০১২ সালে রেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে তাঁর আসল রাজনৈতিক মঞ্চ ছিল পশ্চিমবঙ্গই—যেখানে তিনি নিঃশব্দ কৌশল ও সাংগঠনিক দক্ষতায় ক্ষমতার অঙ্ক কষতেন।
২০১১-পরবর্তী উত্থান: দলবদলের স্থপতি
২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের ঐতিহাসিক জয়ে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটে। সেই সময় থেকেই রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক অভূতপূর্ব দলবদলের ঢেউ ওঠে, যার নেপথ্য কারিগর হিসেবে উঠে আসেন মুকুল রায়। বিরোধী-নিয়ন্ত্রিত পুরসভা ও জেলা পরিষদ দ্রুত শাসকদলের দখলে আসে। কংগ্রেস ও সিপিএমের বহু নেতা নতুন ক্ষমতার কেন্দ্রের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেন।
একসময় মতাদর্শিক দৃঢ়তার জন্য পরিচিত পশ্চিমবঙ্গে দলত্যাগ ছিল বিরল ঘটনা। কিন্তু রায়ের সময়েই তা কৌশল ও প্রদর্শনের রূপ নেয়। কাউন্সিলরদের পতাকা বদল, বিধায়কদের পরিকল্পিত সাংবাদিক সম্মেলনে যোগদান—সংখ্যাগত আধিপত্য প্রকাশ্যে মঞ্চস্থ হতে থাকে। এই সাংগঠনিক দক্ষতা তাঁকে ‘পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতির চাণক্য’ উপাধি এনে দেয়। অনেকের কাছে তিনি ছিলেন কঠোর বাস্তববাদী; অন্যদের কাছে সুযোগসন্ধানী। তবে সংগঠক হিসেবে তাঁর দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি প্রায় কেউই।
বিতর্ক ও দূরত্ব: তৃণমূলের ভেতরের পরিবর্তন
তাঁর রাজনৈতিক উত্থান বিতর্কমুক্ত ছিল না। সারদা চিটফান্ড ও নারদ স্টিং মামলায় তাঁর নাম উঠে আসে, যদিও তিনি বরাবর অভিযোগ অস্বীকার করেন। একইসঙ্গে তৃণমূলের অভ্যন্তরে ক্ষমতার ভারসাম্য ক্রমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চারপাশে কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিনি দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও কার্যত দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন। পরে তাঁকে ওই পদ থেকে সরানো হয়; যদিও পরে সহ-সভাপতি করা হয়, সেখান থেকেও তিনি ইস্তফা দেন। ২০১৭ নাগাদ তাঁর ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত তিনি তৃণমূল ত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দেন—যে দল তৃণমূলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তখন দ্রুত উত্থান ঘটাচ্ছিল। তৃণমূলের বিস্তারের স্থপতির এই দলবদল ছিল গভীর প্রতীকী তাৎপর্যপূর্ণ।
বিজেপি অধ্যায়: পাল্টা দলবদলের স্থপতি
বিজেপিতে যোগ দিয়ে রায় তাঁর বহু পরীক্ষিত কৌশল প্রয়োগ করেন। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচন ও ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সংগঠন গড়ে তোলায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। একাধিক তৃণমূল নেতা তাঁর পথ অনুসরণ করে বিজেপিতে যোগ দেন। ২০১৯ সালে ৪২টির মধ্যে ১৮টি লোকসভা আসনে বিজেপির জয়ে তাঁর নিয়োগ-কৌশলের বড় ভূমিকা ছিল বলে দলীয় নেতারা দাবি করেন। ২০২০ সালে তাঁকে বিজেপির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি করা হয়।
২০২১ সালে কৃষ্ণনগর উত্তর আসন থেকে বিজেপি প্রার্থী হিসেবে বিধায়ক নির্বাচিত হন তিনি। তবে নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই, যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফিরলেন, মুকুল রায় পুনরায় তৃণমূলে প্রত্যাবর্তন করেন। দলকে তিনি বলেন তাঁর “প্রথম ও শেষ ঘর”।
প্রত্যাবর্তনের পর অবসান
তবে সেই প্রত্যাবর্তনের সময়ের মুকুল রায় আর আগের সেই অদম্য সংগঠক ছিলেন না। ২০২১ সালের পর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি হতে থাকে। অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিনি বিধানসভার পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দেন। জনসমক্ষে উপস্থিতি কমে যায়, একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। যে রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি একসময় রাতভর বৈঠক ও নীরব দরকষাকষিতে ক্ষমতার মানচিত্র বদলে দিতেন, সেখান থেকেই ধীরে ধীরে সরে যান।
তৃণমূলে ফিরে এলেও তিনি আর কেন্দ্রীয় ভূমিকা পাননি। দলের ভেতরে নতুন শক্তিকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। দলবদল বিরোধী আইনে কলকাতা হাইকোর্ট তাঁকে বিধায়ক পদে অযোগ্য ঘোষণা করে। পরে সুপ্রিম কোর্ট সেই সিদ্ধান্তে স্থগিতাদেশ দেয়। রাজনৈতিক জীবনের পরিহাসে, যে আইনকে তিনি দীর্ঘদিন দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছিলেন বলে সমালোচকেরা বলতেন, শেষ জীবনে সেই আইনই তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োগ হয়।
উত্তরাধিকার: পোস্ট-২০১১ রাজনীতির প্রতিচ্ছবি
১৫তম ও ১৬তম বিধানসভা পর্বে বাম ও কংগ্রেস থেকে তৃণমূলে ব্যাপক দলবদল পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতির বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়—যার সাংগঠনিক সংস্কৃতি নির্মাণে মুকুল রায়ের বড় ভূমিকা ছিল। তিনি ছিলেন মঞ্চের চেয়ে নেপথ্যের মানুষ; স্লোগানের চেয়ে সংখ্যার কারিগর; প্রকাশ্য নেতৃত্বের চেয়ে কৌশলের স্থপতি। আন্দোলনের মুখ হয়তো তিনি ছিলেন না, কিন্তু তার স্থপতি ছিলেন প্রায়ই।
মুকুল রায়ের জীবন পশ্চিমবঙ্গের ২০১১-পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রতিচ্ছবি—মতাদর্শের কঠোর সীমারেখার ক্ষয়, দলবদলের রাজনীতি, কৌশলগত পুনর্বিন্যাস এবং আবেগের চেয়ে ক্ষমতা-রাজনীতির আধিপত্য। তাঁর মৃত্যুতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মঞ্চ হারাল এক দক্ষ নেপথ্য-পরিচালককে—যিনি ছায়ার আড়ালেই ক্ষমতার গতিপথ নির্ধারণ করতেন, আর শেষ পর্যন্ত নীরবেই বিদায় নিলেন, যেমন নীরবতায় তিনি দীর্ঘদিন রাজনীতি চালিয়েছেন।
শোকপ্রকাশ
প্রবীণ রাজনীতিবিদ মুকুল রায়ের আকস্মিক প্রয়াণে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শোকবার্তায় তিনি বলেন, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসেবে মুকুল রায়ের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সমাজসেবামূলক কাজ স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি প্রয়াত নেতার পরিবার ও সমর্থকদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শোকপ্রকাশ বার্তায় বলেন, মুকুল রায় ছিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী এবং বহু আন্দোলন-সংগ্রামের সহযোদ্ধা। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দলের জন্য তাঁর অবদান স্মরণ করে তিনি জানান, বাংলার রাজনীতিতে মুকুলের সাংগঠনিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি মুকুল রায়ের পুত্র শুভ্রাংশু রায়কে মানসিকভাবে দৃঢ় থাকার আহ্বান জানিয়ে আশ্বাস দেন যে এই কঠিন সময়ে দল তাঁর পাশে রয়েছে।
প্রবীণ রাজনীতিবিদ মুকুল রায়ের আকস্মিক প্রয়াণে গভীর শোকপ্রকাশ করলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এক্স হ্যান্ডলে শোকবার্তায় মুকুল রায়কে তৃণমূল কংগ্রেসের ‘ফাউন্ডিং পিলার’ বলে উল্লেখ করলেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। অভিষেক বলেন, ‘বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগের সমাপ্তি হলো। তিনি বিপুল অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এক প্রবীণ নেতা ছিলেন। রাজ্যের জনজীবন এবং রাজনৈতিক জার্নির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় গঠনে সহায়তা করেছিলেন তিনি। তিনি সংগঠনের গঠনমূলক বছরগুলিতে সংগঠনের সম্প্রসারণ ও সুসংহতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। জনজীবনের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হবে।’ অভিষেকের কথায়, ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা স্তম্ভ হিসেব মুকুল রায় দলের গঠনমূলক বছরগুলিতে সংগঠনের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। জনজীবনের প্রতি তাঁর অবদান শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হবে। তাঁর পরিবার, বন্ধু, অনুরাগীদের প্রতি আমার সমবেদনা। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।’
