ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানালেন কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন। তিনি অভিযোগ করেন, মুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলিকে পরিকল্পিতভাবে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক মূলধারা থেকে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
রবিবার কেরল মুসলিম জামাতের আয়োজিত ‘কেরল যাত্রা’-র সমাপ্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে বিজয়ন বলেন, কেন্দ্রের সাম্প্রতিক নীতি ও আইন গোটা দেশজুড়ে মুসলিমদের মধ্যে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ তৈরি করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, “এই দেশের মুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কেন্দ্র সরকারের একাধিক সিদ্ধান্ত সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য নয়, বরং সংখ্যালঘুদের আলাদা করে রাখার এবং সংবিধানের প্রতি তাদের আস্থা দুর্বল করার উদ্দেশ্যেই নেওয়া হয়েছে।”
প্রখ্যাত মুসলিম ধর্মীয় পণ্ডিত এ পি আবুবকর মুসালিয়ারের নেতৃত্বে কেরল যাত্রা ১ জানুয়ারি কাসারগোড় থেকে শুরু হয়ে রাজ্যের সর্বত্র পরিভ্রমণ করে রাজধানীতে এসে শেষ হয়। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল ঐক্য, সাংবিধানিক অধিকার এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এদিন উপস্থিত হয়েছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। নাগরিকত্ব আইন ও ওয়াক্ফ আইন সংশোধনের প্রস্তাবিত পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে বিজয়ন বলেন,“এই ধরনের আইন বর্জনের বার্তা দিচ্ছে। এই আইনগুলি নিরপেক্ষ নয়। এগুলি মুসলিমদের নিজেদের দেশেই বহিরাগত বলে মনে করাচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলি সমান নাগরিকত্বের মূলনীতিকে ক্ষুণ্ণ করছে।”
বিজেপি-শাসিত একাধিক রাজ্যের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মুসলিমদের প্রতিদিন অপমান, হুমকি ও হিংসার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তিনি উত্তরপ্রদেশের সাম্প্রতিক একটি ঘটনার উল্লেখ করেন, যেখানে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এক নেতাকে অস্ত্র বিতরণ করতে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিংসার আহ্বান জানাতে দেখা গেছে। বিজয়নের কথায়, “মব লিঞ্চিং, প্রকাশ্য হুমকি ও ঘৃণামূলক ভাষণ ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, উত্তরাখণ্ড, রাজস্থান, হরিয়ানা ও অসম থেকে আসা ঘটনাগুলি একটি বিপজ্জনক প্রবণতার দিকেই ইঙ্গিত করছে। ক্ষমতাসীনদের নীরবতা এই শক্তিগুলিকে আরও সাহসী করে তুলছে।”
তিনি বলেন, “বিরোধী দলগুলি বারবার এই বিষয়গুলি তুলে ধরেছে এবং নির্বাচনের সময় জনরোষ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মানুষ প্রশ্ন করছে—সরকার কেন সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং ঘৃণা ছড়ানোদের কেন শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না।” দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ভিত্তি গুরুতর চাপে রয়েছে বলে সতর্ক করে বিজয়ন বলেন, মুসলিম ও খ্রিস্টানদের উপাসনালয়ে হামলা একটি বৃহত্তর বিভাজনের রাজনীতির অংশ। “এগুলি কোনও দুর্ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত,” মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী।
কেরলের নিজস্ব ইতিহাসের প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যে অতীতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সময়ও দেখা গেছে। বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট সরকারের দৃঢ় পদক্ষেপ শান্তি বজায় রেখেছে এবং আরও হিংসা রোধ করেছে। তাঁর সাফ কথা, “ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান নিলেই সাম্প্রদায়িকতাকে পরাস্ত করা সম্ভব।” শেষে তিনি জনগণকে ধর্মের নামে ঘৃণা ছড়ানো শক্তির বিরুদ্ধে সজাগ থাকার এবং সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। বিজয়নের মতে, “এই ধরনের যাত্রা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলি সমাজকে মনে করিয়ে দেয়—ঐক্যই আমাদের শক্তি। ভারত কোনও একটি ধর্ম বা একটি মতাদর্শের নয়, এই দেশ সকলের।”
