TOP NEWS

পাঁচ পয়সার ক্ষুরের গল্প: সময় বদলেছে, বদলায়নি হাঁটের নাপিতদের জীবন

(ইসলামপুরে কাঠের পিঁড়িতে বসেই চলছে চুল-দাড়ি কাটা। || Image: Daily Domkal)

নিজস্ব সংবাদদাতা, ইসলামপুর: সময়ের স্রোতে বদলে গেছে গ্রামের চেহারা, বদলেছে মানুষের জীবনযাপন, বদলেছে চুল কাটার ধরণও। একসময় যেখানে গ্রামের মোড়ে মোড়ে কাঠের পিঁড়িতে বসেই চলত চুল-দাড়ি কাটার কাজ। সেখানে এখন অনেক জায়গায় তৈরি হয়েছে আধুনিক সেলুন। দামি চেয়ার, ঝকঝকে আয়না, নানা নামী কোম্পানির প্রসাধনী সামগ্রী, এমনকি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘর—সব মিলিয়ে আজকের গ্রামবাংলার সেলুনগুলো অনেকটাই শহুরে রূপ নিয়েছে। নতুন প্রজন্মের তরুণদের ভিড়ও সেখানেই বেশি।

কিন্তু এই পরিবর্তনের ভিড়ের মাঝেই এখনও কোথাও কোথাও টিকে আছে পুরোনো দিনের পেশা আর সেই পেশার মানুষগুলো। ইসলামপুরের ভৈরব নদীর পাড়ের বিভিন্ন হাঁটে এখনও দেখা যায় ইট বা মাটির উপর বসে চুল-দাড়ি কাটানোর দৃশ্য। আধুনিক সেলুনের চাকচিক্যের বাইরে দাঁড়িয়ে, এক ঝোলা সরঞ্জাম নিয়েই এখনও দিন কাটান এই নাপিতরা। তাদের জীবনযুদ্ধ আর পেশার খোঁজ নিল ‘ডেইলি ডোমকল’

একসময় মাত্র পাঁচ পয়সায় দাড়ি কাটা হত। সময়ের সঙ্গে সেই অঙ্ক অবশ্য বদলেছে। কিন্তু বদলায়নি এই পেশার মূল কাঠামো। এখনও একটি ঝোলায় করে ক্ষুর, কাঁচি, ফিটকিরি আর একটি কাঠের পিঁড়ি নিয়েই হাঁটে হাঁটে ঘুরে কাজ করেন তারা। স্থানীয় নাপিত সুনীল প্রামাণিক জানালেন, তাদের জীবনে চাহিদা খুব বেশি নেই। “আমরা খুব বেশি কিছু চাই না। এভাবেই দিন চলে গেলেই আমরা খুশি,” বললেন তিনি। তাঁর কথায়, এই পেশা তাঁদের কাছে শুধু রোজগারের মাধ্যম নয়, বরং বংশ পরম্পরায় পাওয়া একটি পরিচয়ও।

(ইসলামপুরের গোপীনাথপুর হাঁটে চুল কাটা। || নিজস্ব চিত্র।)

আরেক নাপিত জীবন প্রামাণিক স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমি যখন প্রথম এই পেশায় কাজ শুরু করি, তখন দাড়ি কাটার জন্য নেওয়া হত পাঁচ পয়সা। সেই সময় মানুষ খুবই কম টাকায় কাজ করাতেন।” এখন অবশ্য সময় বদলেছে। তিনি জানান, বর্তমানে দাড়ি কাটার জন্য নেওয়া হয় প্রায় ১৫ টাকা। আর চুল ও দাড়ি একসঙ্গে কাটলে খরচ হয় ৩০ টাকা। তবে শুধু পারিশ্রমিকের অঙ্ক বাড়লেই যে জীবনের উন্নতি হয়েছে, তা নয়। জীবন প্রামাণিকের কথায়, “আমাদের কোনও স্থায়ী দোকান নেই। আমরা হাঁটে হাঁটে ঘুরে কাজ করি। সবদিন রোজগারও হয় না। কোনও দিন একটু ভালো হয়, আবার কোনও দিন একেবারেই হয় না।”

এই নাপিতরা সাধারণত দল বেঁধে বিভিন্ন এলাকার হাঁটে যান। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে যে হাঁট বসে, সেই অনুযায়ী তারা কাজের জায়গা ঠিক করেন। ব্যাড়েনগর, পাহাড়া, গোপীনাথপুর—এলাকার বিভিন্ন হাটেই দেখা মেলে তাদের।

গোবিন্দ প্রমাণিক এই পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন খুব ছোট বয়সেই। তিনি জানান, মাত্র দশ বছর বয়স থেকে তিনি নাপিতের কাজ শুরু করেন। একটি ব্যাগে করে ক্ষুর, কাঁচি এবং অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে হাঁটে হাঁটে ঘুরে কাজ করাই তার জীবনের বাস্তবতা। গোবিন্দ বলেন, “আমার বয়স যখন দশ বছর, তখন থেকেই এই কাজ করি। আমাদের ভাগ্যে লেখাপড়া জোটেনি। সংসারের দায়ে বাবা-দাদাদের পেশাকেই আঁকড়ে ধরতে হয়েছে।” তাঁর কথায়, দারিদ্র্যের কারণে স্কুলে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তাই ছোট বয়স থেকেই কাজের জগতে ঢুকে পড়তে হয়েছে। তিনি আরও জানান, “আমাদের কোনও দোকান নেই। এভাবেই হাঁটে হাঁটে ঘুরে কাজ করি। কোনও দিন ১০০ টাকা রোজগার হয়, আবার কোনও দিন ৩০০ টাকাও হয়।”

তবে এই আয়ও নিয়মিত নয়। কারণ প্রতিদিন হাঁট বসে না। সপ্তাহে নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনেই কাজের সুযোগ থাকে। বাকি দিনগুলোতে কীভাবে সংসার চলে? গোবিন্দের উত্তর, “হাঁট না থাকলে মাঠে কাজ করতে হয়। কখনও কৃষিকাজ করি, কখনও দিনমজুরি।” এই পেশার আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে খরিদ্দারদের মধ্যে। আগে গ্রামের সব বয়সের মানুষই এই হাটের নাপিতদের কাছে চুল বা দাড়ি কাটাতেন। কিন্তু এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। গোবিন্দ জানান, “আমাদের খরিদ্দার এখন মূলত বৃদ্ধ বা বয়স্ক মানুষ। নতুন প্রজন্মের যুবকরা আমাদের কাছে খুব একটা আসে না। তারা বড় বড় সেলুনে যায়।”

(এক বৃদ্ধের চুল কাটছেন নাপিত। || নিজস্ব চিত্র।)

গ্রামের তরুণদের কাছে এখন আধুনিক সেলুনই বেশি আকর্ষণীয়। সেখানে রয়েছে নানা ধরনের স্টাইলিশ চুল কাটার ব্যবস্থা, ফেসিয়াল, হেয়ার কালারসহ বিভিন্ন পরিষেবা। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই হাঁটের নাপিতদের কাজের ক্ষেত্র ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। তবু পেশা ছাড়ার কথা ভাবেন না তারা। কারণ এই কাজই তাদের পরিচয়, এই কাজেই অভ্যস্ত তাদের হাত। সুনীল প্রামাণিক বলেন, “এই কাজই আমাদের বাপ-ঠাকুরদার পেশা। এতদিন ধরে করে আসছি, এখন আর অন্য কিছু করতে পারব না।”

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই মনে করেন, এই নাপিতরা গ্রামীণ সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাঁটের দিনগুলোতে তাদের উপস্থিতি যেন গ্রামের পুরোনো দিনের স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনে। ভৈরব নদীর পাড়ের সেই হাঁটে গেলে এখনও দেখা যায়—একটি ইটের উপর বসে রয়েছেন একজন গ্রাহক, পাশে দাঁড়িয়ে নাপিত হাতে ক্ষুর বা কাঁচি। ঝোলার ভিতরে রাখা আছে ফিটকিরি, চিরুনি আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। নেই কোনও আধুনিক চেয়ার, নেই বড় আয়না, নেই এসি-র আরাম। তবু সেই সরল ব্যবস্থাতেই চলছে কাজ।

এই দৃশ্য যেন গ্রামীণ জীবনের এক অন্য ছবি তুলে ধরে—যেখানে সময় এগিয়ে গেলেও কিছু কিছু পেশা এখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো আধুনিকতার দৌড়ে এই পেশা ক্রমশ হারিয়ে যাবে একদিন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত ইসলামপুরের ভৈরব নদীর পাড়ের হাঁটগুলোয় সেই পাঁচ পয়সার ক্ষুরের গল্প জীবন্ত হয়ে আছে—এক ঝোলা সরঞ্জাম আর কঠিন জীবনসংগ্রামকে সঙ্গী করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!