TOP NEWS

তামাকের ‘গ্ল্যামার’ কি আগামীর মহামারি? শিশু-কিশোরদের নিয়ে শঙ্কিত বিশেষজ্ঞরা

(Representation || Image Credit: guardian.ng)

ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: ক্যান্সার ও ফুসফুস রোগের কারণে মহামারির দিকে এগোচ্ছে দেশ, তামাক নিয়ে সতর্ক করলেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, যে পরোক্ষ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তামাকের ক্রমবর্ধমান গ্ল্যামারাইজেশন এবং টফি–ক্যান্ডির সঙ্গে পাশাপাশি বিক্রি করে এর স্বাভাবিকীকরণ শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে। তাদের বক্তব্য, এই প্রবণতা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে আগামী বছরগুলোতে দেশে ক্যান্সার ও ফুসফুসজনিত রোগের নতুন মহামারি দেখা দিতে পারে। এই সতর্কতা উঠে আসে ‘ট্যাক দ্য সাইলেন্ট পুশ: টোব্যাকো অ্যান্ড ইয়াং ইন্ডিয়া’ শিরোনামের একটি ওয়েবিনার থেকে, যা নাগরিক উদ্যোগ টোব্যাকো ফ্রি ইন্ডিয়া—র আয়োজনে জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে স্বামী বিবেকানন্দের জন্মবার্ষিকীতে অনুষ্ঠিত হয়।

ওয়েবিনারে বক্তারা বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত তামাক নিয়ন্ত্রণে প্রশংসনীয় কিছু পদক্ষেপ নিলেও ১০ থেকে ২০ বছর বয়সী শিশু ও তরুণদের লক্ষ্য করে এখন আরও সূক্ষ্ম ও পরোক্ষভাবে প্রচার চালানো হচ্ছে। তারা বলেন, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরোক্ষ প্রচারণা নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধিনিষেধ, বিক্রয়স্থলে দৃশ্যমানতা সীমাবদ্ধ করা এবং তামাককে শিশুদের পণ্যের সঙ্গে বিক্রির প্রবণতা বন্ধ করা জরুরি। পাশাপাশি তামাক কেনার আইনি বয়স বাড়ানো, একক স্টিক বিক্রি নিষিদ্ধ করা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়।

আইসিএমআর-এর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ক্যান্সার প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চের পরিচালক ড. শালিনী সিং বলেন, তামাকের প্রভাব শিশুদের জীবনে খুব সাধারণ ও দৈনন্দিন স্তর থেকেই শুরু হয়—দোকানের কাউন্টার থেকে শুরু করে পরোক্ষ ব্র্যান্ডিং পর্যন্ত। তিনি বলেন, ‘‘বিক্রয়স্থলে যখন তামাকজাত পণ্য শিশুপণ্যগুলোর পাশে খোলা অবস্থায় প্রদর্শিত হয়, তখন সেটা শিশুদের কাছে ভুল বার্তা দেয় যে এসব ক্ষতিকর নয়।’’ ব্র্যান্ডিং সংকেত ও পরোক্ষ প্রচারণা এসব প্রভাবকে আরও জোরদার করে, বলে মন্তব্য করেন তিনি। অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, এমন বহুস্তরীয় প্রভাব তামাককে তরুণদের কাছে নিরীহ, সহজলভ্য ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হিসেবে তুলে ধরে।

শিশুস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে কথা বলতে গিয়ে ইন্টারন্যাশনাল পেডিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক ড. নবীন ঠাক্কর বলেন, সমস্যার সূচনা সমাজ যেখান থেকে ধরে, তারও আগে। গান্ধীনগরে পরিচালিত তার নেতৃত্বাধীন এক সমীক্ষার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, প্রায় ১০ বছর বয়সী প্রতি ছয় জন শিশুর একজন ইতোমধ্যেই তামাক পরীক্ষামূলকভাবে গ্রহণ করেছে। এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দিল্লির প্রাক্তন এমস্‌ পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. এম সি মিশ্র বলেন, ‘‘আজই যদি আমরা হস্তক্ষেপ না করি এবং শিশুদের তামাক-উন্মুক্ততা কমাতে না পারি, তাহলে আমরা স্পষ্টতই ক্যান্সার ও ফুসফুসজনিত রোগের পরবর্তী মহামারির দিকে এগোচ্ছি।’’

এনসিইআরটি-র সাবেক পরিচালক প্রফেসর জে এস রাজপুত সেলিব্রিটি-সংযুক্ত পরোক্ষ ব্র্যান্ডিংকে আরও উদ্বেগজনক দিক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘‘শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষে হয় না, শিশুরা সমাজ থেকে শেখে। যখন অভিনেতা বা ক্রীড়াবিদরা পরোক্ষভাবে তামাক ব্র্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হন, তখন সেটা শক্তিশালী কিন্তু বিভ্রান্তিকর বার্তা দেয়। সমাজ ও সরকার—দু’পক্ষকেই দায় নিতে হবে।’’

ওয়েবিনারে বক্তারা আরও বলেন, তামাকের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রবেশ দেরি করাতে পারলে দীর্ঘমেয়াদি আসক্তি ও রোগের ঝুঁকি কমে। এজন্য তামাক কেনার আইনি বয়স বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে—যেমন মদ্যপানের ক্ষেত্রে রয়েছে। বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, শুরুর বয়স সামান্য দেরি করানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদে রোগের বোঝা ও আসক্তি উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। এছাড়া শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রলোভন তৈরি করছে একক স্টিক বা ‘সিঙ্গেল স্টিক’ বিক্রির প্রচলন, যা খরচ কমিয়ে তামাক পরীক্ষা করার সুযোগ বাড়ায়। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ গজের মধ্যে তামাক বিক্রি নিষিদ্ধ থাকার পরও কার্যকরী প্রয়োগে এখনও ঘাটতি রয়েছে বলে বক্তারা উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানে স্বামী বিবেকানন্দকে স্মরণ করে বক্তারা বলেন, জাতীয় যুব দিবসে তামাক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা তার আদর্শের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হতে পারে। ড. ঠাক্কর বলেন, ‘‘বিবেকানন্দের দৃষ্টিতে দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে স্বাস্থ্যবান ও সক্ষম যুবশক্তির ওপর। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে তামাক থেকে রক্ষা করতে পারলে ভারত এই ক্ষেত্রে বিশ্বনেতা হিসেবেও উঠে আসতে পারে।’’ বক্তারা মনে করিয়ে দেন যে ভারতের আইনে সরাসরি তামাক বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ থাকলেও প্রচারণা এখন বেশি দেখা যায় দৈনন্দিন দৃশ্যমানতা ও নৈকট্যের মাধ্যমে—যেমন পাড়ার দোকান, কিওস্ক ও স্টলের মাধ্যমে, যেগুলো শিশুরা নিয়মিত ব্যবহার করে এবং যেখানে তামাক প্রায়ই শিশুদের পণ্যের পাশে বিক্রি হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!