ডেইলি ডোমকল, নিউইয়র্ক: ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে গ্রেফতার করেছে মার্কিন বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রে মাদুরোর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। ইতিমধ্যে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার দপ্তরের সদ্য উন্মুক্ত এক অভিযোগপত্রে মাদুরোর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও মাদক-সন্ত্রাসবাদের ষড়যন্ত্রসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। মাদুরো, তাঁর স্ত্রী ও ছেলের পাশাপাশি আরও তিনজনের নামও অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২০ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্সিয়াল মেয়াদকালে ম্যানহাটনের একটি আদালতে মাদুরোর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযোগসমূহ⇒
নার্কো-সন্ত্রাসবাদী ষড়যন্ত্র: অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, দীর্ঘ ২৫ বছরের সরকারি জীবনে মাদুরো বিশ্বের “সবচেয়ে সহিংস ও প্রভাবশালী মাদক পাচারকারী ও নার্কো-সন্ত্রাসীদের” সঙ্গে অংশীদারিত্বে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘অস্ত্র’ হিসেবে হাজার হাজার টন কোকেন পাঠানোর সুবিধা করে দেন।
কোকেন আমদানি ষড়যন্ত্র: ‘কার্টেল অব দ্য সানস’, সিনালোয়া কার্টেল ও ট্রেন দে আরাগুয়া গ্যাংসহ শক্তিশালী মাদকচক্রগুলো সরকারের সঙ্গে সরাসরি কাজ করত; সুরক্ষার বিনিময়ে মুনাফা ভাগাভাগি হতো।
মেশিনগান ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের দখল: মাদক পাচার সহজ করতে মেশিনগান ও ‘ধ্বংসাত্মক অস্ত্র’ ব্যবহার ও দখলের অভিযোগ।
মেশিনগান ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্র দখলের ষড়যন্ত্র: মাদক রুট রক্ষায় নিরাপত্তা কাঠামো, বিশেষ করে ট্রেন দে আরাগুয়া গ্যাং ব্যবহারের অভিযোগ।
কূটনৈতিক পাসপোর্ট জালিয়াতি: ২০০৬–২০০৮ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে মাদুরো মাদক পাচারকারীদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট দেন এবং মেক্সিকো থেকে ভেনেজুয়েলায় মাদক-লব্ধ অর্থ ফেরাতে ব্যবহৃত বিমানের জন্য কূটনৈতিক আড়াল নিশ্চিত করেন।
স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসেরবিরুদ্ধে অভিযোগ⇒
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ফ্লোরেস আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে পাচারকারীদের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের যোগাযোগ করিয়ে দেন। এর মধ্যে জাতীয় মাদকবিরোধী সংস্থার প্রধানের সঙ্গে এক বৃহৎ পাচারকারীর বৈঠকের ব্যবস্থাও ছিল।
মাদুরো দম্পতির বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, যারা তাদের মাদক কার্যক্রমে বাধা দিয়েছে বা টাকা বাকি রেখেছে—তাদের বিরুদ্ধে অপহরণ, মারধর ও হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগপত্রে কারাকাসের এক স্থানীয় মাদকচক্র নেতার হত্যার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
মাদুরোর ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ⇒
নিকোলাস এরনেস্তো মাদুরো গুয়েরা, যিনি ‘দ্য প্রিন্স’ নামে পরিচিত, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে মাসে দু’বার করে মার্গারিটা দ্বীপে যেতেন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ফ্যালকন ৯০০ বিমানে করে প্যাকেটভর্তি মালামাল নিয়ে ফিরতেন—যেগুলোতে মাদক ছিল বলে অভিযোগ। তিনি ভেনেজুয়েলা থেকে মায়ামিতে শত শত কিলোগ্রাম কোকেন পাঠানোর কাজে যুক্ত ছিলেন বলে বলা হয়েছে। অভিযোগপত্রে নিউইয়র্কে নিম্নমানের কোকেন পাঠানোর পরিকল্পনা, মায়ামির কাছে ৫০০ কিলোগ্রাম কোকেন খালাসের ব্যবস্থা এবং স্ক্র্যাপ ধাতুর কনটেইনারে কোকেন লুকিয়ে নিউইয়র্ক বন্দরে আনার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
ভেনেজুয়েলার মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ⇒
স্বরাষ্ট্র, ন্যায় ও শান্তিমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো রন্দোন: ২০০৬ সালে ভেনেজুয়েলা থেকে মেক্সিকোতে ৫.৫ টন কোকেন পাঠাতে সহায়তা এবং এর বিনিময়ে ২৫ লাখ ডলার গ্রহণের অভিযোগ।
প্রাক্তন মন্ত্রী রামোন রদ্রিগেস চাসিন: মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ এবং এক বৃহৎ পাচারকারীকে গ্রেপ্তার ও প্রত্যর্পণ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার অভিযোগ।
অভিযুক্ত গ্যাং নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ⇒
ট্রেন দে আরাগুয়া গ্যাংয়ের কথিত নেতা হেক্টর রুথস্টেনফোর্ড গেরেরো ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যা, মাদক ও অস্ত্র পাচার, পতিতাবৃত্তি, মানবপাচার, ডাকাতি, ব্যাংক ভাঙচুর এবং অর্থপাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে—ভেনেজুয়েলা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ভেনেজুয়েলার শীর্ষ নেতৃত্ব “জনবিশ্বাসের পদ অপব্যবহার করে একসময়ের বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে যুক্তরাষ্ট্রে টনের পর টন কোকেন আমদানি করেছে।” এতে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক নির্বাচনে পরাজয় সত্ত্বেও দেশের “ডি ফ্যাক্টো কিন্তু অবৈধ শাসক” ক্ষমতায় টিকে ছিলেন।
মার্কিন বিদেশ মন্ত্রকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালের মধ্যে প্রতিবছর ২০০ থেকে ২৫০ টন কোকেন ভেনেজুয়েলা হয়ে পাচার হতো। অভিযোগপত্রে উল্লেখ, উপকূল থেকে দ্রুতগামী নৌকা, মাছধরা ট্রলার ও কনটেইনার জাহাজে করে উত্তরমুখী সমুদ্রপথে এসব চালান যেত। আকাশপথে চালান পাঠানো হতো গোপন কাঁচা বা ঘাসের এয়ারস্ট্রিপ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বাণিজ্যিক বিমানবন্দর থেকেও।
