ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: উত্তরপ্রদেশের মীরাঠে এক দলিত মহিলাকে খুন করে তার কন্যাকে অপহরণের ঘটনায় যোগী সরকারকে তীব্র আক্রমণ করল কংগ্রেস। সোমবার কংগ্রেস বলেছে, মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের ‘বুলডোজার’ কেবল তখনই চলে, যখন অভিযুক্তরা দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘু বা ওবিসি সম্প্রদায়ের হয়। দলের তফসিলি জাতি (এসসি) দফতরের চেয়ারপার্সন রাজেন্দ্র পাল গৌতম বলেন, বিজেপি সরকারগুলির পৃষ্ঠপোষকতায় দেশে জাতি ও ধর্মের ভিত্তিতে ঘৃণা উসকে দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, আদিত্যনাথের বুলডোজার চালানোর ক্ষেত্রেও জাতি ও ধর্মের হিসাব করা হয়, আর যখন উত্তরপ্রদেশে কোনও দলিত নিগৃহীত হন, তখন বুলডোজার নড়েও না।
গৌতম জানান, দিল্লিতে কংগ্রেসের প্রতিবাদ কর্মসূচির জন্য পুলিশ অনুমতি দেয়নি, যুক্তি দেওয়া হয়—প্রদর্শনের অনুমতি নাকি ১০ দিন আগে চাওয়া হয়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “দেশের কোথাও ধর্ষণ বা খুন হলে কি তাহলে ন্যায় চাওয়ার আগে ১০ দিন অপেক্ষা করতে হবে? সরকার সময়মতো ব্যবস্থা নিলে এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করলে আমাদের প্রতিবাদ করতে হতো না।” তাঁর অভিযোগ, সরকারের উদ্দেশ্য জনগণের কণ্ঠ দমন করা—যা সংবিধানবিরোধী। তিনি বলেন, “বিজেপি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশে জাতি ও ধর্মের ভিত্তিতে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগীজি দলিত, আদিবাসী ও অনগ্রসরদের দমন করতে সরকারি যন্ত্র ব্যবহার করছেন। বুলডোজার চালানোর ক্ষেত্রেও জাতি ও ধর্ম দেখা হয়। যখন কোনও দলিত আক্রান্ত হন, তখন বুলডোজার নড়ে না।”
মীরাঠের ঘটনায় তিনি দাবি করেন, এক কিশোরী তার মাকে সঙ্গে নিয়ে বনাঞ্চলের দিকে যাচ্ছিল। সেখানে মেয়েটিকে অপহরণ করা হয় এবং মাকে বাধা দিতে গেলে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। “আমরা যখন নিহতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাই, আমাদের থামিয়ে দেওয়া হয়। উত্তর প্রদেশ পুলিশ যদি অপরাধ প্রতিরোধ ও অপরাধীদের শাস্তির ক্ষেত্রে একইরকম তৎপর হতো, তাহলে অপরাধ কমে যেত,” মন্তব্য গৌতমের। তিনি আরও দাবি করেন, গত পাঁচ বছরে দেশে দলিতদের ওপর অত্যাচারের সর্বাধিক ঘটনা উত্তর প্রদেশেই ঘটেছে। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, “দেশের পাঁচটি বিজেপি-শাসিত রাজ্য—উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র ও বিহারে—এ ধরনের ৭৬ শতাংশ ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে একাই উত্তর প্রদেশে ২৬ শতাংশ ঘটনা সামনে আসে। স্পষ্টই বোঝা যায়, বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে দলিতদের বিরুদ্ধে অপরাধ বাড়ছে এবং পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে না।”
প্রসঙ্গত, উত্তরপ্রদেশের মিরাটে দলিত মহিলাকে খুন করে তাঁর মেয়েকে অপহরণ করা। বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) সকালে ঘটনাটি ঘটে উত্তরপ্রদেশের মীরঠের সারধনা থানা এলাকার কাপসাদ গ্রামে। এই ঘটনায় তীব্র উত্তেজনা ছড়ায়। ঘটনাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা অবনতির হওয়ার আশঙ্কায় এলাকায় ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল প্রায় ৮টার সময় মা–মেয়ে দু’জন মাঠের দিকে যাওয়ার পথে খালে কাছে অভিযুক্ত পারাস তাঁদের পথ আটকায়। পারাস একজন স্থানীয় ডাক্তারখানায় কম্পাউন্ডার হিসেবে কাজ করত। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, পারাস ও ওই ২০ বছরের তরুণী একই গ্রামের বাসিন্দা এবং তারা একে অপরকে চিনতেন। পারাস প্রথমে তাঁদের সঙ্গে অশোভন আচরণ শুরু করে। তাতে আপত্তি জানালে অভিযুক্ত ধারালো আখ কাটার অস্ত্র দিয়ে তরুণীর মায়ের মাথায় আঘাত করে এবং এরপর জোর করে মেয়েটিকে তুলে নিয়ে যায়। চিৎকার শুনে আশপাশের গ্রামবাসীরা ছুটে এসে গুরুতর আহত মহিলাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসার সময়ই তিনি মারা যান।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। ভীম আর্মির কর্মী ও স্থানীয়রা অভিযুক্তের অবিলম্বে গ্রেফতারের দাবি জানান। এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে বাগ্যুদ্ধের ঘটনাও ঘটে। মীরঠের এসএসপি বিপিন টাডা জানান, অভিযুক্তকে গ্রেফতার এবং অপহৃত তরুণীকে উদ্ধারের জন্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গ্রামীণ)-এর নেতৃত্বে পাঁচটি বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে। সার্কেল অফিসার অশুতোষ কুমারের বক্তব্য, অভিযোগের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই মামলা রুজু হয়েছে।
এই ঘটনাকে “দুঃখজনক এবং উদ্বেগজনক” বলে কড়া ভাষায় রাজ্য সরকারকে আক্রমণ করেছেন বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি) সুপ্রিমো মায়াবতী। এক্স-এ পোস্ট করে তিনি লেখেন, “উত্তরপ্রদেশের মীরঠে সারধনা থানা এলাকায় একটি দলিত মা-কে হত্যা ও তার কন্যাকে অপহরণের ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক, লজ্জাজনক এবং গভীর উদ্বেগের।” তিনি আরও বলেন, “মহিলাদের মর্যাদাহানি এবং তার পরবর্তী খুনের ঘটনাগুলিকে সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধ রোখা যায়।”
