ডেইলি ডোমকল, ইন্দোর: ডবল ইঞ্জিনের মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে দূষিত জল খেয়ে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। অসুস্থের সংখ্যাও শতাধিক। তারা প্রত্যেকে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। চাপের মুখে কড়া পদক্ষেপ করতে শুরু করেছে মোহন যাদবের সরকার।
মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে নাটকীয়তা
ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, দূষিত জল খেয়ে ঠিক কতজনের মৃত্যু হয়েছে? যদিও মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে প্রশাসনিক মহলে নাটকীয়তা দেখা গিয়েছে। ইন্দোরের ভাগীরথপুরা এলাকায় দূষিত জল খেয়ে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে প্রশাসন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, দূষিত জল খেয়ে ডায়ারিয়ার প্রাদুর্ভাবে অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ছয় মাসের এক শিশুও রয়েছে। অন্যদিকে, বুধবার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব মৃতের সংখ্যা মাত্র ‘চার’ বলে দাবি করেছেন। তার ঠিক কয়েক ঘণ্টা পর ইন্দোরের মেয়র পুষ্যমিত্র ভার্গব সাত জনের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন।
মৃতের সংখ্যা নিয়ে মধ্যপ্রদেশের নগর উন্নয়ন ও আবাসনমন্ত্রী কৈলাস বিজয়বর্গীয় বলেন, “প্রশাসনিক আধিকারিকরা আমাকে জানিয়েছেন যে চার জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে স্থানীয়ভাবে আট থেকে ন’জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি যাচাই করা হবে। যদি সেই তথ্য সঠিক প্রমাণিত হয়, তবে মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব যে আর্থিক সাহায্যের কথা ঘোষণা করেছেন, তা মৃতদের পরিবারকে দেওয়া হবে।”
সবমিলিয়ে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের প্রশ্ন, মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা জানাতে ভয় করছে সরকার! এই কঠিন পরিস্থিতিতে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে তারা (রাজ্য সরকার) নাটক করছে বলে কটাক্ষ করেছে কংগ্রেস।
কিভাবে দূষিত হল প্রানীয় জল!
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, পানীয় জলের পাইপলাইনে লিকেজের কারণে ড্রেনের নোংরা (নিকাশির) জল ঢুকে পড়েছিল। এর ফলেই ভাগীরথপুরা এলাকায় ডায়ারিয়ার প্রাদুর্ভাব ঘটে।
উল্লেখ্য, এই এলাকা মধ্যপ্রদেশের নগর উন্নয়ন ও আবাসনমন্ত্রী কৈলাস বিজয়বর্গীয়ের ইন্দোর-১ বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কৈলাস বিজয়বর্গীয় বলেন, প্রায় ১,৪০০ থেকে ১,৫০০ মানুষ এই ঘটনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২০০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। মন্ত্রীর কথায়, “হাসপাতালে ভর্তি সব রোগীই এখন বিপন্মুক্ত এবং শারীরিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় ধারাবাহিকভাবে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।”
এলাকা পরিদর্শনে মুখ্যসচিব
এদিকে, অতিরিক্ত মুখ্যসচিব সঞ্জয় দুবে স্থানীয় আধিকারিকদের সঙ্গে নিয়ে ভাগীরথপুরা এলাকা পরিদর্শন করে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, পানীয় জলের পাইপলাইনের লিকেজ মেরামতির পর বৃহস্পতিবার থেকে ওই এলাকায় জল সরবরাহ স্বাভাবিক করা হয়েছে। পাশাপাশি, একাধিক বাড়ি থেকে জলের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রশাসনের আশ্বাস, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কড়া পদক্ষেপ-দুই আধিকারিক সাসপেন্ড
প্রশাসন সূত্রে খবর, দূষিত জলে মৃত্যুর কারণে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে জল সরবরাহের দায়িত্বে থাকা সহকারী ইঞ্জিনিয়ার ও জোনাল অফিসার-কে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সাব-ইঞ্জিনিয়ারকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। দূষণের উৎস খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নিরাপদ পানীয় জল সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইন্দোরের জেলাশাসক শিবম ভার্মা জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে সমস্ত আক্রান্তের চিকিৎসা করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৪৯ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং তাঁদের শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আরও আক্রান্তের খোঁজে ও রোগের বিস্তার ঠেকাতে বাড়ি বাড়ি সমীক্ষা চালানো হচ্ছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রায় ২,৭০০টি বাড়িতে সমীক্ষা হয়েছে এবং সংলগ্ন এলাকাতেও এই কাজ বাড়ানো হচ্ছে। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এএনএম ও আশা কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওআরএস প্যাকেট বিতরণ করছেন।
আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
বুধবারই অসুস্থদের দেখতে একাধিক হাসপাতালে যান মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব। তিনি জানিয়েছেন, ইন্দোরের ভাগীরথপুরা এলাকায় দূষিত জলের ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে এবং কোনও রকম গাফিলতি সরকার বরদাস্ত করবে না। বিশেষত যেসব এলাকায় জল সরবরাহ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। সংবাদমাধ্যমকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “পানীয় জলের সরবরাহে সমস্যার কারণে বহু মানুষ বমি ও ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হন। বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। দু’-তিন দিনের মধ্যে ৪০ হাজারের বেশি মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২,৪৫৬ জনকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং ২১২ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। ৫০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন, এখনও ১৬২ জন চিকিৎসাধীন।” গাফিলতির দায়ে ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। যাদবের কথায়, “ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে না ঘটে, তার জন্য পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে।” ইতিমধ্যে মুখ্যমন্ত্রী মৃতদের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করেছেন এবং সকল আক্রান্তের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

One thought on “মধ্যপ্রদেশে বিষজলে প্রাণ কাড়ল বহু, মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে নাটকীয়তা”