ডেইলি ডোমকল, নয়াদিল্লি: সমাজকর্মী উমর খালিদ ও শারজিল ইমাম-কে জামিন দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট। দুই ছাত্রনেতার জামিন না মেলায় এবার কেন্দ্রকে নিশানা করলেন তৃণমূলের রাজ্যসভা সাংসদ সাকেত গোখলে। তিনি কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, যাঁদের সরকার “অস্বস্তিকর” মনে করে, তাঁদের কারাবন্দি করতে কঠোর আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একইসঙ্গে রাজ্যসভা সাংসদ বলেন, জামিনে অস্বীকৃতি ভারতের বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে কার্যত একটি অভিযোগপত্র।
সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ এক পোস্টে গোখলে বলেন, বিচার প্রক্রিয়া শুরুই না হওয়া সত্ত্বেও খালিদ ও ইমামকে দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি করে রাখা একটি “ভাঙা বিচারব্যবস্থার” নগ্ন ছবি তুলে ধরে—যেখানে রাষ্ট্রের অভিযোগকেই প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া হয় এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা উপেক্ষিত হয়। গোখলের বক্তব্য, “উমর ও শারজিলের মতো মামলায়, যেখানে বিচার এখনও শুরুই হয়নি, সেখানে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার কোনও পূর্বধারণা থাকতে পারে না।”
সতর্ক করে তৃণমূল সাংসদ বলেন, আদালত যদি সংবিধানিক মূল্যবোধ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে সংবিধানের নিশ্চয়তাগুলির কোনও বাস্তব মূল্য থাকে না। “সংবিধান কেবল কাগজে লেখা কথায় পরিণত হয়, যদি আদালত তার মূল্যবোধ রক্ষা না করে,” এমনই মন্তব্য করে তিনি একে গণতন্ত্র ও সমাজব্যবস্থার ভাঙনের সঙ্গে তুলনা করেন। সাংসদ অভিযোগ করেন, মোদী সরকার নিয়মিতভাবে ইউএপিএ (Unlawful Activities Prevention Act) ও পিএমএলএ (Prevention of Money Laundering Act)-এর মতো আইন ব্যবহার করে সমালোচক ও ভিন্নমতাবলম্বীদের জেলে ভরছে। তাঁর কথায়, “এটাই একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের স্বভাব।” তিনি আরও বলেন, ভারতের রাজনীতিতে এই প্রবণতা নতুন না হলেও, একে রুখে দেওয়ার ক্ষমতা ও দায়িত্ব একমাত্র বিচারব্যবস্থারই রয়েছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি রায়ের কথা উল্লেখ করে গোখলে জানান, সুপ্রিম কোর্টের কিছু বেঞ্চ এই প্রবণতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। তিনি বিচারপতি অভয় ওকা ও অগাস্টিন মাসিহ-এর রায়ের উল্লেখ করেন, যেখানে ইউএপিএ মামলাতেও জামিনই নিয়ম, জেল ব্যতিক্রম—এই নীতি পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। অন্য কিছু বেঞ্চ, তাঁর দাবি, বিচারিক সীমার মধ্যে থেকে পিএমএলএ-র কঠোর দিকগুলি “ধীরে ধীরে” লঘু করার চেষ্টা করেছিল। গোখলে বলেন, “কিন্তু এই মামলায় সেই নীতি পরিত্যক্ত হয়েছে। রাষ্ট্রের অভিযোগকে অন্ধভাবে মেনে নেওয়া যায় না। সেগুলির ন্যায্য বিচারের মাধ্যমে যাচাই হওয়া দরকার।” তাঁর অভিযোগ, এর ফলে খালিদ ও ইমামকে অন্তত আরও এক বছর—বিচার শুরু না হয়েই—জেলে কাটাতে হতে পারে।
বিচারব্যবস্থার নৈতিক বিপর্যয় তুলে ধরতে গিয়ে গোখলে বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র-র সঙ্গে তুলনা টানেন। তাঁর দাবি, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিল্লি দাঙ্গার সময় কপিল মিশ্রকে “প্রকাশ্যে উসকানি দিতে দেখা গেলেও” তিনি কখনও বিচারের মুখোমুখি হননি। বর্তমানে তিনি একজন মন্ত্রী। “মন্ত্রী হিসেবে কপিল মিশ্রই এখন রাষ্ট্র,” মন্তব্য করেন গোখলে।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি উত্তর-পূর্ব দিল্লির মৌজপুর চকে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)-এর সমর্থনে এক সমাবেশে কপিল মিশ্র দিল্লি পুলিশকে বিক্ষোভ সরানোর জন্য প্রকাশ্যে আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। এই বক্তব্য পরবর্তীতে দাঙ্গার দায়বদ্ধতা নিয়ে বিস্তর আলোচনায় উঠে আসে। গোখলের অভিযোগ, “সেই একই রাষ্ট্র উমর ও শারজিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। আর সুপ্রিম কোর্ট ‘দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ’—এই প্রতিষ্ঠিত নীতির বদলে সেই অভিযোগের দিকেই ঝুঁকেছে।” তাঁর কথায়, “যে ব্যবস্থা কপিল মিশ্রকে পুরস্কৃত করে অথচ উমর খালিদ ও শারজিল ইমামকে জেলে আটকে রাখে, তা গভীরভাবে ও মৌলিকভাবে ভেঙে পড়েছে।”
সোমবার সুপ্রিম কোর্ট রায়ে জানায়, ইউএপিএ-র আওতায় “সন্ত্রাসী কার্যকলাপ” কেবল চূড়ান্ত হিংসাত্মক কাজেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিকল্পনা, সমন্বয়, সংগঠিত করা বা সম্মিলিত কার্যকলাপের মাধ্যমেও তা সংঘটিত হতে পারে। এই যুক্তিতে আদালত খালিদ ও ইমামকে জামিন দিতে অস্বীকার করে। আদালত জানায়, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি প্রাথমিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে। দু’জনেই বর্তমানে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিচার ছাড়াই কারাবন্দি। আদালত আরও স্পষ্ট করে যে, সন্ত্রাসবাদ কেবল অস্ত্র ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; অভিযুক্ত কাজের নকশা, উদ্দেশ্য ও প্রভাব—এই সবকিছুই বিবেচ্য।
