নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন তৈরি করল সিপিএমের অন্দরমহলের অস্বস্তি। দলের কাজকর্ম ও নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রাথমিক সদস্যপদ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তরুণ নেতা প্রতীকউর রহমান। রাজ্য নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে লেখা তাঁর পদত্যাগপত্র প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। নির্বাচনের প্রাক্কালে এই ঘটনাকে ঘিরে সিপিএমের সাংগঠনিক অবস্থান ও কৌশল নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
সূত্রে জানা গেছে, প্রতীকউর রহমান তাঁর চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে জেলা ও রাজ্য নেতৃত্বের একাধিক ভাবনা ও কর্মপদ্ধতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছেন না তিনি। এই পরিস্থিতিতে মানসিক দ্বন্দ্বের মধ্যেই দিন কাটছে বলে দাবি করেছেন তিনি। দীর্ঘদিনের সংগঠক হিসেবে দলের প্রতি শ্রদ্ধা ও আনুগত্যের কথা উল্লেখ করলেও বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান।
প্রতীকউর রহমানের এই পদক্ষেপ ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা সামনে আসছে। বিশেষত, সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক -এর বিরুদ্ধে অসন্তোষের ইঙ্গিত রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে দলের রাজ্য সম্পাদক জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধানের সঙ্গে বৈঠককে ঘিরে দল ও বাম শিবিরের একাংশে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে তখন থেকেই জল্পনা শুরু হয়। প্রতীকউর রহমান ওই বৈঠককে ভালোভাবে নেননি বলেও তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলে আলোচনা চলছিল। শুধু সিপিএমের অন্দরেই নয়, বামফ্রন্টের শরিক দলগুলির মধ্যেও ওই বৈঠক নিয়ে অসন্তোষের সুর শোনা গিয়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে হস্তক্ষেপ করতে হয় বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান -কেও। দলীয় ঐক্য ও নির্বাচনী প্রস্তুতির স্বার্থে বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনাও হয় বলে জানা গেছে। সেই আবহেই প্রতীকউর রহমানের সদস্যপদ ত্যাগের সিদ্ধান্ত কার্যত ‘পত্রবোমা’ হিসেবে সামনে এসেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচনের আগে এ ধরনের পদত্যাগ কেবল ব্যক্তিগত মতপার্থক্যের ইঙ্গিত নয়, বরং সংগঠনের ভিতরে জমে থাকা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশও হতে পারে। বিশেষত তরুণ নেতৃত্বের একাংশ যদি বর্তমান কৌশল বা জোট-রাজনীতির দিকনির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তা ভবিষ্যতে সংগঠনের শক্তি ও জনভিত্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে। বাম রাজনীতির পুনর্গঠনের প্রশ্নে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা নিয়ে যখন নতুন করে আলোচনা চলছে, তখন প্রতীকউর রহমানের সরে দাঁড়ানো তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, সিপিএমের একটি অংশের মতে, গণতান্ত্রিক সংগঠনে মতভেদ থাকতেই পারে এবং তা নিয়ে দলীয় স্তরে আলোচনা হওয়াই স্বাভাবিক। একজন নেতার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে দলের সামগ্রিক অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে দেখা ঠিক নয় বলেও তাঁদের বক্তব্য। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্য নেতৃত্বের তরফে এখনও কোনও প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
বিধানসভা নির্বাচনের আগে সংগঠন মজবুত করা, জোট-সমীকরণ নির্ধারণ এবং জনভিত্তি পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা সিপিএমের জন্য এই পদত্যাগ নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর। প্রতীকউর রহমানের এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে আরও কোনও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস বা মতভেদের ইঙ্গিত বহন করছে কি না, তা নিয়েই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।
