নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: আধুনিক ডিজিটাল যুগে যখন পরিষেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজতর হওয়ার কথা, তখন মুর্শিদাবাদের ডোমকলের সাধারণ মানুষের জীবনে এক বিষম লড়াই বয়ে এনেছে এসআইআর (SIR) বা বিশেষ ভোটার তালিকায় সংশোধনীর শুনানি। ‘নিজভূমে পরবাসী’ হওয়ার সুপ্ত আতঙ্ক আর প্রশাসনিক জটিলতার অক্টোপাসে আজ ডোমকলের বাসিন্দারা দিশেহারা। ডোমকলের শুনানি কেন্দ্রগুলি এখন আর কেবল সরকারি দপ্তর নয়, বরং হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষের কাছে এক চরম উৎকণ্ঠা ও ‘আধুনিক প্রশাসনিক হয়রানি’র সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনমজুরের রোজগার বন্ধ করে নথির পেছনে হন্যে হয়ে ঘোরা থেকে শুরু করে ঘরে কোলের শিশুদের ফেলে আসা মায়েদের দীর্ঘশ্বাস—সব মিলিয়ে ডোমকলের জনজীবন এখন এক অনিশ্চিত ভয়ের ছায়ায় আচ্ছন্ন।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) ডোমকল বিডিও অফিস চত্বরে শুনানি কেন্দ্রে হাজিরা দিতে এসে শত শত মানুষের চোখে-মুখে ধরা পড়ল ক্লান্তি, ক্ষোভ আর এক অজানা আতঙ্ক। এদিন সকাল সকাল ডোমকল বিডিও অফিসের শুনানি কেন্দ্রে হাজির হয়েছিলেন আরজুমা বিবি। ঘরে তাঁর তিন ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে। ভাবছিলেন, কাজ মিটিয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরে রান্নাবান্না করবেন। সকাল সাড়ে ১০টার রিপোর্ট করার কথা থাকলেও ভিড় এড়াতে তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন সকাল ৯টায়। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা ১২টা পেরোলেও লাইনের কোনো নড়চড় হয়নি। চরম উদ্বেগ নিয়ে আরজুমা ‘ডেইলি ডোমকল’-কে বলেন, “রান্নাবান্নাও করে আসিনি। ছোট ছেলে-মেয়েরা বাড়িতে একা। ভাবলাম আগেভাগে এলে আগে কাজ মিটবে। কিন্তু এখন বারোটা বাজে, কখন শেষ হবে কিছুই বুঝতে পারছি না।” শেষমেশ দুপুর ১টার সময় কাজ মিটিয়েই আধপেটা ছেলে-মেয়ের টানে বাড়ির পথে পা বাড়ান তিনি। যাওয়ার সময় বিড়বিড় করে বলে গেলেন, “আর দাঁড়াব না। আমার ছেলে-মেয়েরা হয়তো কান্নাকাটি করে বাড়ি মাথায় তুলেছে।”
আরজুমার মতো একই হাহাকার রাজমিস্ত্রি শ্রমিক মাফিকুল আনসারীর। মাফিকের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে এসআইআর নোটিশ। তাঁর অপরাধ? নথিতে দেখা যাচ্ছে তাঁর মায়ের সঙ্গে তাঁর বয়সের পার্থক্য মাত্র ১৫ বছর। এই অসংগতি দূর করতে গত তিন দিন ধরে কাজ কামাই করে কাগজের পিছনে পড়ে আছেন তিনি। মাফিকুল বলেন, “আমি রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে। কাজ করলে খেতে পাই, না করলে উপোস। তিন দিন ধরে কাগজের পিছনে ছুটছি, কাজে যেতে পারিনি। পকেটে টাকা নেই, কীভাবে সংসার চলবে? সরকার কেন আমাদের ওপর এই অত্যাচার করছে? আমি না খেয়ে মরলে কি সরকার খাবার দেবে?” দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর যখন আধিকারিকদের হাতে নথি দিলেন ১৬৫ নং বুথের রমনা এতবার নগরের বাসিন্দা মাফিকুল। তখন তাঁরা (আধিকারিক) সাফ জানিয়ে দিলেন—আরও কিছু কাগজ লাগবে। ফের বাড়ির দিকে দৌড়াতে হলো নথির সন্ধানে।

ডোমকলের ৮ নং বুথ বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই শুনানি আসলে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করা ছাড়া আর কিছুই নয়। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড বা ড্রাইভিং লাইসেন্স—সবই যখন সরকারের দেওয়া, তবে সেগুলোকে কেন পর্যাপ্ত নথি হিসেবে ধরা হচ্ছে না? বিক্ষুব্ধ এক বাসিন্দা প্রশ্ন তোলেন, “কেন ২০০২ সালের তালিকাকেই মূল ভিত্তি ধরা হচ্ছে? সীমান্ত এলাকার বহু মানুষ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেননি। তাঁদের স্কুল সার্টিফিকেট আছে, অথচ কমিশন সেটাকে তালিকায় রাখেনি কেন? নির্বাচন কমিশন সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছেলেখেলা করছে।”
শুনানি কেন্দ্রে আসা মানুষের জন্য ন্যূনতম মানবিক পরিকাঠামোও নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রখর রোদে বয়স্ক মানুষদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। নেই বসার জায়গা, নেই পানীয় জলের ব্যবস্থা। ভুক্তভোগী গোলাম গাউসের অভিযোগ, “একই কাগজের বারবার ফটোকপি চাওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মীরা কোনো সহযোগিতা করছেন না। তথ্যের স্পষ্ট অভাব রয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়ানোর পর যখন বলা হয় অমুক কাগজ নেই, তখন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে।”
ডোমকল মুসলিম পাড়ার রুবিয়া খাতুনের কথায়, “নথিপত্রের জটিলতা আর প্রশাসনিক যাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ মানুষ। ভোটার তালিকার বিশেষ পরিমার্জন বা এসআইআর (SIR) শুনানির নামে সরকারি দপ্তরে যে চিত্র উঠে আসছে, তাকে এক কথায় ‘আধুনিক প্রশাসনিক হয়রানি’ বলাই যথাযথ।” অনেক নাগরিকের প্রশ্ন, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে যেখানে সবকিছু অনলাইনে পাওয়া সম্ভব, সেখানে ডিজিটাল ডেটাবেস থেকে তথ্য যাচাই না করে কেন মানুষকে কাগজের বস্তা নিয়ে বারবার দপ্তরে ছোটানো হচ্ছে?
পুরো বিষয়টি নিয়ে ডোমকল প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তারা সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আধিকারিক জানিয়েছেন, তাঁরা কেবল নির্বাচন কমিশনের দেওয়া নির্দেশিকা পালন করছেন। তালিকার ভুলভ্রান্তি সংশোধনের জন্যই এই কড়াকড়ি করা হচ্ছে বলে তাঁদের দাবি।
প্রশাসনিক ভাষা যাই হোক না কেন, ডোমকলের সাধারণ মানুষের মনে দানা বাঁধছে এক অজানা ভয়। নিজের দেশে থেকেও কি তারা ‘পরবাসী’ হয়ে যাবেন? এই আশঙ্কা থেকেই পকেটের কড়ি খরচ করে, কাজ কামাই করে মানুষ নথির পেছনে হন্যে হয়ে ঘুরছে। এই হয়রানির শেষ কোথায়, তা এখন কারোরই জানা নেই।
