নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কৃষকদের সুবিধার্থে নির্মিত ডোমকল মহকুমার দুটি ঝাঁ চকচকে কৃষক বাজার আজ বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে। মস্ত লোহার গেটের ওপর ঝুলছে পুরনো সাইনবোর্ড, ভাঙাচোরা মরচে ধরা ধরম কাঁটার পাশে পড়ে রয়েছে যন্ত্রাংশের অংশবিশেষ। ঝাঁ চকচকে ভবনগুলির রং ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে। প্রায় এক দশক আগে ইসলামপুরের গোয়াস ও জলঙ্গির জোড়তলায় কৃষকদের উৎপাদিত শাকসবজি ও কৃষিপণ্য সরাসরি বিক্রির সুযোগ করে দিতে গড়ে তোলা হয়েছিল এই বাজারগুলি। লক্ষ্য ছিল—মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষকদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা। কিন্তু উপযুক্ত পরিকল্পনার অভাব এবং স্থানীয় দুষ্কৃতীদের দাপটের জেরে আজ এই বাজারগুলি কার্যত অচল।
স্বপ্নের শুরু ও বাস্তব রূপ
ডোমকল মহকুমা কৃষিপ্রধান এলাকা হিসেবে পরিচিত। বছরভর এখানে প্রচুর পরিমাণে ধান, গম ও বিভিন্ন ধরনের আনাজ উৎপাদন হয়। কৃষকদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, উৎপাদিত ফসলের সঠিক দাম পাওয়ার জন্য এমন একটি কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন যেখানে ফড়েদের দৌরাত্ম্য থাকবে না। এই চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে প্রায় ১০ বছর আগে ইসলামপুরের গোয়াসে এবং জলঙ্গির জোড়তলায় অত্যাধুনিক কৃষক বাজার তৈরির উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হয়েছিল একাধিক ভবন, আলাদা করে বিক্রির জায়গা, পণ্য সংরক্ষণের জন্য গুদামঘর এবং ট্রাক ও পণ্য ওজন করার জন্য অত্যাধুনিক ধরম কাঁটা। সেই সময় এলাকার কৃষকরা এই বাজার ঘিরে বিস্তর স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁদের আশা ছিল, এই কৃষক বাজারের মাধ্যমে সরাসরি আড়তদার বা বড় ব্যবসায়ীদের কাছে ফসল বিক্রি করে তাঁরা লাভবান হবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
ভিন্ন সংকট, কিন্তু ফলাফল একই
বাজার চালু হওয়ার এক দশক পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ ভবন অচল হয়ে পড়ে রয়েছে। কোটি টাকার বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে এই কৃষক বাজারগুলি মূলত ধান কেনাবেচার কেন্দ্র হিসেবেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। শাকসবজি বা অন্যান্য কৃষিপণ্য বিক্রির জন্য কৃষকরা আর এখানে আসেন না। এই ব্যর্থতার পেছনে গোয়াস এবং জোড়তলায় ভিন্ন ভিন্ন কারণ থাকলেও, দুটির মূলে রয়েছে চরম অব্যবস্থাপনা।
গোয়াস কৃষক বাজার: সঠিক পরিকল্পনার অভাব
গোয়াসের কৃষক বাজারটির ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কৃষকরা এবং স্থানীয় বাসিন্দারা এর ভৌগোলিক অবস্থানকে দায়ী করেছেন। বাজারটি মূল বাজার এলাকা থেকে অনেকটা দূরে হওয়ায় ব্যবসায়ীদের আনাগোনা একেবারেই নেই। এর ফলে গ্রাহকদেরও সেখানে যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়নি। স্থানীয় কৃষক আফতাফ মোল্লা আক্ষেপের সুরে বলেন, “প্রথমে সরকার অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম পাইকারি ব্যবসায়ী সরাসরি এসে আমাদের ফসল কিনবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, সঠিক পরিকল্পনার অভাবে বাজারটা জমেই উঠল না। মূল শহর বা লোকালয় থেকে দূরে হওয়ায় সেখানে পণ্য নিয়ে গেলে গাড়ি ভাড়া বেশি পড়ে, সময়ও নষ্ট হয়। ব্যবসায়ীরাই যদি না আসে, তবে কৃষকরা কেন সেখানে গিয়ে ফসল ডাম্প করে আসবে?” এই বাজারের ধরম কাঁটাটি এখন অকেজো হয়ে পড়ে আছে। আর ভবনের দেয়ালে ফাটল ধরেছে।
জলঙ্গি জোড়তলা বাজার: তোলাবাজির দাপট
জলঙ্গির জোড়তলার কৃষক বাজারের ভৌগোলিক অবস্থান মোটের ওপর ভালো হলেও, এখানকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। স্থানীয় কৃষকদের একাংশ এবং ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজার তৈরির পর থেকেই স্থানীয় দুষ্কৃতীদের দাপাদাপি শুরু হয়। তোলাবাজি ও অতিরিক্ত চাঁদা আদায়ের কারণে দোকান নিতে চাওয়া কৃষকরাও মুখ ফিরিয়ে নেয়। স্থানীয় জেলা পরিষদ সদস্য ইমরান হোসেন এই ব্যর্থতার জন্য দুষ্কৃতীদের দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, কৃষক বাজার তৈরির সময় কৃষকদের অনেক স্বপ্ন ছিল। প্রথম দিকে আগ্রহও দেখা গিয়েছিল। কিন্তু দুষ্কৃতীদের তাণ্ডব ও অতিরিক্ত তোলা আদায়ের জেরে যারা দোকান নিয়েছিল, তারাও ব্যবসা ছেড়ে পালিয়ে যায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ মানুষও এখন সেখানে ভয়ে ঢোকে না। এই বাজারেও ধরম কাঁটার একাংশ ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। ভবনের রং চটে গিয়ে কঙ্কালসার চেহারা নিয়েছে।
প্রশাসনের ভূমিকা ও প্রশ্নচিহ্ন
কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি এভাবে নষ্ট হওয়ার পেছনে প্রশাসনের উদাসীনতাকেও দায়ী করছেন স্থানীয়রা। সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ না করা এবং ব্যবসায়ী ও কৃষকদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে ব্যর্থতার কারণে এই প্রকল্পগুলি হোঁচট খেয়েছে। এই বিষয়ে ডোমকলের এসডিও শুভঙ্কর বালা বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কেন বাজারগুলি ঠিকমতো চালু হলো না, তা তদন্ত করে দেখা হবে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, তদন্তের পর আদৌ কি এই বাজারগুলির পুনর্জন্ম হবে? কৃষকরা বলছেন, এখন শুধুমাত্র তদন্তের আশ্বাস নয়, প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা এবং দুষ্কৃতী দমন। নাহলে কৃষকদের সুবিধার্থে নির্মিত এই ‘কৃষক বাজার’ প্রকল্পের মৃত্যু সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
