TOP NEWS

ঘৃণার গ্রাসে দেশ! ২০২৫-এ লাফিয়ে বেড়েছে ঘৃণাভাষণ: রিপোর্ট হেট ল্যাবের

(Representation Image || Image Credit: AI)

ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: ২০২৫ সালে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্যের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি প্রকাশিত ইন্ডিয়া হেট ল্যাবের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ঘৃণাভাষণের ঘটনা বেড়েছে ১৩ শতাংশ, আর ২০২৩ সালের তুলনায় এই বৃদ্ধি প্রায় ৯৭ শতাংশ। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, অধিকাংশ ঘটনাই ঘটেছে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে।

রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে ঘৃণাভাষণের এই বৃদ্ধি ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে “সংকীর্ণ মানসিকতার বক্তব্যের স্বাভাবিকীকরণ”-এর ইঙ্গিত দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “এই ধরনের বক্তব্য এখন হিন্দুত্ববাদী চরমপন্থী শক্তিগুলির জন্য সারাক্ষণ ব্যবহৃত এক কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।” ইন্ডিয়া হেট ল্যাবের অভিযোগ, ২০২৫ সালে ঘৃণাভাষণের মূল চালিকাশক্তি ছিল ক্ষমতাসীন বিজেপি ও তাদের হিন্দু জাতীয়তাবাদী সহযোগীদের “সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী আদর্শিক প্রকল্প”, যারা ঘৃণাভাষণ ছড়ানোর ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় উঠে এসেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ধর্মীয় নেতা, রাজনৈতিক দল ও জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলি সংখ্যালঘুদের ঘিরে ভয়ভীতির বয়ান তৈরি করে ঘৃণাভাষণকে উসকে দিয়েছে। এই বয়ানগুলিতে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের “দেশবিরোধী, বিপজ্জনক, রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত নয় এবং জনসংখ্যাগতভাবে হুমকিস্বরূপ” হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

যে সব বক্তব্য আগে ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল, তা ধীরে ধীরে জনপরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে এবং এখন নির্বাচনী রাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় নিরাপত্তা ও পরিচয় সংক্রান্ত বিতর্ককেও প্রভাবিত করছে বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সরাসরি সভা-সমাবেশে দেওয়া ঘৃণাভাষণেও হিন্দু জাতীয়তাবাদী মূল ধারণাগুলির পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে—বিশেষত “মুসলিমদের চিরস্থায়ী বহিরাগত ও হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি” হিসেবে চিত্রিত করার প্রবণতা।

২০২৫ সালে সারা দেশে মোট ১,৩১৮টি ঘৃণাভাষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় চারটি করে ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার সংখ্যা এক হাজার ছাড়ানোর মধ্যে উত্তরপ্রদেশে ২৬৬টি, মহারাষ্ট্রে ১৯৩টি এবং মধ্যপ্রদেশে ১৭২টি ঘৃণাভাষণের ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে—এই তিন রাজ্যই বিজেপি বা বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের শাসনে রয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, মোট ঘটনার ৯৮ শতাংশ ক্ষেত্রে মুসলিমদের সরাসরি লক্ষ্য করা হয়েছে—এমন ঘটনা ছিল ১,১৫৬টি। পাশাপাশি ১৩৩টি ঘটনায় মুসলিমদের সঙ্গে খ্রিস্টানদেরও লক্ষ্য করা হয়েছে। খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ঘৃণাভাষণ নথিভুক্ত হয়েছে ১৬২টি ঘটনায়, যা মোট ঘটনার ১২ শতাংশ এবং ২০২৪ সালের তুলনায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি। যেখানে বিজেপি-শাসিত বা জোটশাসিত রাজ্যগুলিতে ১,১৬৪টি ঘটনা ঘটেছে, সেখানে সাতটি বিরোধী দল শাসিত রাজ্যে ঘটেছে ১৫৪টি ঘটনা—যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৩৪ শতাংশ কম।

ঘৃণাভাষণের তীব্রতা বেড়েছে যে সময়গুলোতে

রিপোর্টে জানানো হয়েছে, এপ্রিল মাসে ঘৃণাভাষণের সর্বোচ্চ মাসিক বৃদ্ধি দেখা যায়। ওই সময়ে ১৫৮টি ঘটনা ঘটে, যা রাম নবমীর শোভাযাত্রা এবং পাহালগাম সন্ত্রাসী হামলার প্রতিক্রিয়ায় আয়োজিত ঘৃণা সমাবেশের সঙ্গে মিলেছে। বিশেষ করে, ২২ এপ্রিল থেকে ৭ মে—এই ১৬ দিনের মধ্যে পাহালগাম হামলার পর ৯৮টি ঘৃণাভাষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা দেশজুড়ে মুসলিম-বিরোধী সক্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ৬৫৬টি বক্তব্যে (প্রায় ৫০ শতাংশ) “লাভ জিহাদ”, “ল্যান্ড জিহাদ”, “পপুলেশন জিহাদ”, “থুক জিহাদ”, “এডুকেশন জিহাদ”, “ড্রাগ জিহাদ” ও “ভোট জিহাদ”-এর মতো ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ব্যবহৃত হয়েছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। এছাড়াও, ২৭৫টি বক্তব্যে গির্জা, মাজার ও মসজিদসহ ধর্মীয় স্থাপনা অপসারণের আহ্বান জানানো হয়েছে। সংখ্যালঘুদের “পরজীবী”, “পোকামাকড়”, “শূকর”, “পাগলা কুকুর”, “সাপের বাচ্চা” ও “রক্তপিপাসু জোম্বি”-র মতো অমানবিক শব্দে বর্ণনা করা হয়েছে বলেও রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে।

উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী অন্যতম প্রধান ঘৃণাভাষণকারী

রিপোর্ট অনুযায়ী, ঘৃণাভাষণের সবচেয়ে বেশি আয়োজক হিসেবে উঠে এসেছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও বজরং দল, যাদের সঙ্গে মোট ২৮৯টি ঘটনার যোগ পাওয়া গেছে। এরপর রয়েছে অন্তর্রাষ্ট্রীয় হিন্দু পরিষদ। উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি-কে ২০২৫ সালের “সবচেয়ে সক্রিয় ঘৃণাভাষণকারী” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁর নামে রয়েছে ৭১টি বক্তব্য। তাঁর পরেই রয়েছেন অন্তর্রাষ্ট্রীয় হিন্দু পরিষদের প্রধান প্রবীণ টোগাড়িয়া এবং বিজেপি নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায়।

রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, ১৪৫টি ঘৃণাভাষণে হিন্দু ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, যা সংখ্যালঘু-বিরোধী বক্তব্যকে ধর্মীয় বৈধতা দিচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, ৬৯টি ঘটনায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের লক্ষ্য করা হয়েছে, এবং ১৯২টি বক্তব্যে “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী” তত্ত্ব ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রায়শই বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত হয়েছে। মোট ১,২১৮টি ঘৃণাভাষণের ঘটনার মধ্যে ১,২৭৮টি ভিডিও হয় সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা হয়েছে, নয়তো সরাসরি লাইভ-স্ট্রিম করা হয়েছে বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!