ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও উত্তেজনার আবহে এক শক্তিশালী কৌশলগত বার্তা দিল ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের দিল্লি সফরে দুই দেশ কেবল অর্থনৈতিক সংহতি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার এক নতুন ব্লুপ্রিন্ট বা নীল নকশা তৈরি করল।
কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং প্রেসিডেন্ট নাহিয়ানের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর দুই দেশ পূর্ণাঙ্গ ‘কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের’ পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই লক্ষ্যে একটি লেটার অফ ইনটেন্ট (LoI) স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিদেশ সচিব বিক্রম মিসরি স্পষ্ট করেছেন যে, এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কোনো আঞ্চলিক সংঘাতে ভারতের জড়িয়ে পড়া নয়, বরং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার একটি পদক্ষেপ।
বাণিজ্যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা
২০২২ সালে দুই দেশের মধ্যে হওয়া অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির (CEPA) সুফল ইতিমধ্যে মিলতে শুরু করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। সোমবার দুই নেতা এই লক্ষ্যমাত্রাকে আরও বাড়িয়ে ২০৩২ সালের মধ্যে ২০০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। গুজরাটের ধোলেরা বিশেষ বিনিয়োগ অঞ্চল এবং ভারতের ন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ডে (NIIF) বিনিয়োগের বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।
জ্বালানি ও পরমাণু ক্ষেত্রে সহযোগিতা
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এইচপিসিএল (HPCL) এবং অ্যাডনক (ADNOC) গ্যাসের মধ্যে ১০ বছরের জন্য একটি এলএনজি (LNG) সরবরাহ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে ২০২৮ সাল থেকে ভারত প্রতি বছর ০.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি পাবে। এছাড়া ভারতের নতুন ‘শান্তি’ (SHANTI) আইনের অধীনে দুই দেশ অসামরিক পরমাণু শক্তি, বিশেষ করে ছোট মডিউলার রিঅ্যাক্টর (SMR) তৈরির ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
মহাকাশ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ভবিষ্যতের প্রযুক্তির কথা মাথায় রেখে মহাকাশ গবেষণা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে নিবিড়ভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুই দেশ। ভারতে একটি সুপারকম্পিউটিং ক্লাস্টার এবং ডেটা সেন্টার স্থাপনের পাশাপাশি ‘ডিজিটাল এমব্যাসি’ বা ডিজিটাল দূতাবাস স্থাপনের মতো আধুনিক ও উদ্ভাবনী ধারণাও আলোচনায় স্থান পেয়েছে।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান
যুগ্ম বিবৃতিতে দুই দেশই সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ সহ সব ধরণের সন্ত্রাসবাদের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। কোনো দেশই যাতে সন্ত্রাসবাদীদের আশ্রয় বা অর্থ সাহায্য না দেয়, সে বিষয়ে একমত হয়েছেন মোদী ও নাহিয়ান।
সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত বন্ধন
দিল্লির আইআইটি (IIT Delhi) এবং আমদাবাদের আইআইএম (IIM Ahmedabad)-এর ক্যাম্পাস ইতিমধ্যে আমিরাতে কাজ শুরু করেছে। সাংস্কৃতিক মৈত্রীর প্রতীক হিসেবে আবুধাবিতে একটি ‘হাউস অফ ইন্ডিয়া’ প্রতিষ্ঠা এবং লোথালের ন্যাশনাল মেরিটাইম হেরিটেজ কমপ্লেক্সে আমিরাতের পক্ষ থেকে প্রত্নবস্তু প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য
প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত শান্তি প্রস্তাব এবং গাজা ইস্যু নিয়ে যখন আন্তর্জাতিক মহল উত্তপ্ত, সেই সময়ে এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর (IMEC) এবং ২০২৬ সালে ভারতের ব্রিকস (BRICS) সভাপতিত্বের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছেন আমিরাত প্রধান।
কূটনৈতিক মহলের মতে, এই তিন ঘণ্টার সফর কেবল সৌজন্য বিনিময় ছিল না; এটি ছিল আগামী ২০ বছরের জন্য এশিয়ার দুই শক্তিশালী দেশের একে অপরের ওপর আস্থার প্রতিফলন। সংকটের সময়ে একে অপরের পরিপূরক হয়ে ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্বমঞ্চে স্থিতিশীলতার এক নতুন স্তম্ভ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল।
