TOP NEWS

মুখ্যসচিবসহ শীর্ষ আমলাদের অপসারণে ক্ষুব্ধ মমতা, নির্বাচন কমিশন ও বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ

(Photo Courtesy: X)

ডেইলি ডোমকল, কলকাতা: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলার প্রশাসনিক স্তরে নজিরবিহীন রদবদল ঘিরে তুঙ্গে উঠল কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত। সোমবার মাঝরাতে নির্বাচন কমিশনের এক নির্দেশে রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীসহ একাধিক শীর্ষ পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্তাকে তাঁদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কমিশনের এই পদক্ষেপকে “গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ” এবং “বিজেপির অঙ্গুলিহেলনে চালিত” বলে তোপ দেগেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার একটি জনসভা থেকে তিনি এই সিদ্ধান্তকে ‘বাংলা-বিরোধী’ ও ‘নারী-বিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে যে রদবদল ঘটেছে, তাতে রাজ্যের শীর্ষ আমলাতান্ত্রিক কাঠামো কার্যত ওলটপালট হয়ে গিয়েছে। রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন ১৯৯৩ ব্যাচের আইএএস অফিসার দুষ্যন্ত নারিয়ালা। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব জগদীশ প্রসাদ মীনাকও পদচ্যুত করা হয়েছে। অপসারণের তালিকায় রয়েছেন রাজ্যের শীর্ষ পুলিশ কর্তা পীযূষ পাণ্ডে এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনার সুপ্রতিম সরকার। কমিশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, অপসারিত এই কর্মকর্তাদের নির্বাচনের কোনো প্রক্রিয়ার সঙ্গেই যুক্ত রাখা যাবে না। এই সিদ্ধান্তের পরই সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

সোমবার রান্নার গ্যাসের (LPG) মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের প্রতিবাদে আয়োজিত একটি মিছিল শেষে জনসভায় বক্তব্য রাখার সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি নির্বাচন কমিশনকে তোপ দাগেন। তিনি অভিযোগ করেন, কমিশন নিরপেক্ষতা হারিয়ে বিজেপির ‘তল্পিবাহক’ হিসেবে কাজ করছে। নন্দিনী চক্রবর্তীর অপসারণ প্রসঙ্গে অত্যন্ত আবেগী ও আক্রমণাত্মক সুরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “একজন বাঙালি নারী, নন্দিনী চক্রবর্তী মুখ্যসচিব হিসেবে কাজ করছিলেন। আপনারা কেবল বাঙালি-বিদ্বেষীই নন, আপনারা অ-বাঙালিদের প্রতিও শত্রুভাবাপন্ন। ১২টা ৩০ মিনিটের পর অত্যন্ত অপমানজনকভাবে গায়ের জোরে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলো। বিজেপির দালালি করতে গিয়ে আপনারা রাজ্য সরকারের সঙ্গে একবার আলোচনা করার প্রয়োজনও মনে করেননি।” মমতা আরও উল্লেখ করেন, জগদীশ প্রসাদ মীনা বা পীযূষ পাণ্ডে বাঙালি না হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের সরিয়ে দেওয়া প্রমাণ করে যে, বিজেপি ও কমিশন কেবল তাদেরই বেছে নিচ্ছে যারা গেরুয়া শিবিরের কথা শুনে চলবে।

কমিশন যাঁদেরই পাঠাক না কেন, তাঁরা শেষ পর্যন্ত বাংলার মানুষের জন্যই কাজ করবেন বলে বিশ্বাস প্রকাশ করেন মমতা। তিনি বলেন, “আপনারা যে অফিসারদেরই পাঠান না কেন, তাঁরা আমাদের হয়েই কাজ করবেন। তাঁরা মানুষের জন্য এবং বাংলার জন্য কাজ করবেন।” তাঁর এই মন্তব্যে পরিষ্কার যে, প্রশাসনিক রদবদল ঘটিয়ে তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তিতে চিড় ধরানো যাবে না বলেই তিনি মনে করছেন।

এদিনের সভায় মুখ্যমন্ত্রী ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) নিয়ে কমিশনের ভূমিকার পুনরুল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, বিশেষ সংশোধনী প্রক্রিয়ায় রাজ্যজুড়ে প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে তৃণমূল আগে থেকেই সরব। মমতার দাবি, এটি ভোটারদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত চক্রান্ত। বিজেপিকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, “ভোটের আগে ওরা অনেক জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু একবার ক্ষমতায় এলে মানুষের বাড়িতে বুলডোজার পাঠিয়ে দেয়।” তিনি আরও দাবি করেন, তাঁর সরকারের আমলে রাজ্যে বেকারত্ব ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং পশ্চিমবঙ্গ বহিরাগত বা অন্য রাজ্য থেকে আসা মানুষকে সর্বদা সম্মান দিয়ে এসেছে।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে দেশে রান্নার গ্যাসের যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা নিয়েও কেন্দ্রকে রেয়াত করেননি মমতা। সাধারণ মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, “জনগণ এবার কেন্দ্র সরকারকে লাইনের বাইরে পাঠিয়ে দেবে।” যদিও কেন্দ্রের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সরবরাহ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ থাকলেও ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টারগুলোতে গ্যাসের কোনো ঘাটতি নেই।

গত শনিবার রাজ্যের ক্যাবিনেট মন্ত্রী শশী পাঁজার বাড়িতে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক মহল। এদিন সেই প্রসঙ্গ টেনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানান। তিনি বলেন, “ক্ষমতা থাকলে আমার বাড়িতে বা তৃণমূলের অন্য নেতাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে দেখান। আমরা জানি কীভাবে প্রতিরোধ করতে হয়।”

নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই বাংলার রাজনৈতিক মাটি তপ্ত হতে শুরু করেছে। একদিকে ৪১ জন বর্তমান বিধায়ককে নিয়ে বিজেপির প্রথম প্রার্থী তালিকা ঘোষণা, আর অন্যদিকে কমিশনের নির্দেশে প্রশাসনিক শীর্ষ স্তরে এই ব্যাপক রদবদল— সব মিলিয়ে ২৩ ও ২৯ এপ্রিলের দুই দফার ভোট যে অত্যন্ত সংঘাতপূর্ণ হতে চলেছে, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলল আজ মমতার রণংদেহী মেজাজে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আমলাদের অপসারণকে কেন্দ্র করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুনরায় ‘বাঙালি আবেগ’ এবং ‘কেন্দ্রীয় বঞ্চনা’র কার্ড খেলেছেন, যা আসন্ন নির্বাচনে শাসক দলের প্রধান হাতিয়ার হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!