TOP NEWS

বৃদ্ধ বয়সে কাঁধে কাগজের ভার, ‘বেনাগরিক’ হওয়ার আশঙ্কায় পঞ্চাশোর্ধ মার্জিয়া

(জুগিন্দা মালোপাড়ার বাসিন্দা বৃদ্ধা মার্জিয়া বিবি। || নিজস্ব চিত্র)

নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: ডোমকল মহকুমা জুড়ে এসআইআর (Special Intensive Revision) সংক্রান্ত শুনানি ঘিরে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের ছবি উঠে আসছে। খসড়া ভোটার তালিকায় নাম না থাকা বা তথাকথিত ত্রুটির কারণে নোটিস পেয়ে মহকুমা শাসকের দপ্তরে হাজির হচ্ছেন বহু বয়স্ক, নিরক্ষর ও প্রান্তিক মানুষ। কাগজের অভাব, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং ‘বেনাগরিক’ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাঁরা মানসিক চাপে ভেঙে পড়ছেন।

নিরক্ষরতা আর দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে সারা জীবন কাটিয়েছেন তিনি। স্কুলের গণ্ডি কোনওদিন পেরোনোর সুযোগ হয়নি। কিন্তু শেষ বয়সে এসে তাঁর ঘাড়ে চেপেছে নথি আর কাগজের ভার। ডোমকল থানার অন্তর্গত জুগিন্দা মালোপাড়ার বাসিন্দা বৃদ্ধা মার্জিয়া বিবি আজ সেই প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে দিশেহারা। জানা গিয়েছে, ২০০২ সালের আগেই মার্জিয়া বিবির বাবা-মা দু’জনেই মারা যান। সেই কারণে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম ওঠেনি। আর সেই সূত্র ধরেই মার্জিয়ার নামও বাদ পড়ে গিয়েছে এসআইআর-এর খসড়া ভোটার তালিকা থেকে। ফলত তাঁকে হেয়ারিংয়ের নোটিস ধরানো হয়েছে। মঙ্গলবার সেই নোটিস হাতে নিয়ে ডোমকল মহকুমা শাসকের দপ্তরে হাজির হন অভিভাবকহারা মার্জিয়া বিবি। চোখে-মুখে স্পষ্ট আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা। হেয়ারিংয়ের অপেক্ষায় বসে থাকাকালীন সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা দেখে আবেগে ভেঙে পড়েন তিনি। ডেইলি ডোমকল-কে মার্জিয়া বলেন, “আমার বাবা-মা তো অনেক আগেই মারা গিয়েছেন। তাই ২০০২ সালের তালিকায় তাঁদের নাম নেই। আমাকে কি তাহলে বিদেশে তাড়িয়ে দেবে?”

সূত্রে জানা গেছে, ২০০২ সালের তালিকায় বাবা-মায়ের নাম না থাকায় মার্জিয়ার নাম খসড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। সেই কারণেই পঞ্চাশোর্ধ বৃদ্ধাকে শুনানির নোটিস দেওয়া হয়। শুনানির দিন তিনি বাড়িতে থাকা সমস্ত নথিপত্র একত্র করে সঙ্গে নিয়ে আসেন। উৎকণ্ঠা নিয়ে মার্জিয়া বিবি বলেন, “বাবার বাড়িতে থাকতে আমার ভোটার কার্ড করা হয়নি। আমরা অশিক্ষিত মানুষ, কীভাবে কী করতে হয় জানতাম না। কাগজপত্রও বুঝি না। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির এলাকায় প্রথম ভোটার তালিকায় নাম ওঠে। আমি তো কিছু বুঝি না, বিএলও বাড়িতে এসে বলেছিলেন এসডিও অফিসে যেতে হবে, তাই আজ এখানে এসেছি।”

কোন কোন নথি তিনি সঙ্গে এনেছেন—এই প্রশ্নের উত্তরে মার্জিয়া জানান, তাঁর আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড সবই সঙ্গে আছে। পাশাপাশি তিনি তাঁর বোনের আধার ও ভোটার কার্ডও এনেছেন। তবে শিক্ষাগত বা জন্ম সংক্রান্ত কোনও শংসাপত্র তাঁর কাছে নেই। “আমি কখনও স্কুলে পড়িনি। সার্টিফিকেট পাবো কোথা থেকে? বাবা-মা তো জন্ম সার্টিফিকেটও করেননি। বাড়িতে যা কাগজ ছিল সবই নিয়ে এসেছি। বাকিটা ওনারা দেখুক, যা ভালো মনে হয় করবেন,” বলেন তিনি।

এসআইআর হেয়ারিং ঘিরে মার্জিয়া বিবির মতো বহু বৃদ্ধ ও প্রান্তিক মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে শুধুমাত্র কাগজের অভাবে নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মানবিক দিক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন সমাজকর্মী থেকে বিশিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!