নিজস্ব সংবাদদাতা, বহরমপুর: মুর্শিদাবাদে ওয়াকফ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে হিংসা ছড়িয়ে পড়েছিল। হিংসার আবহে সামশেরগঞ্জের হরগোবিন্দ দাস ও চন্দন দাস নামের বাবা-ছেলেকে খুন করা হয়েছিল। মঙ্গলবার সেই মামলায় রায় ঘোষণা করল জঙ্গিপুর মহকুমা আদালত। এদিন ১৩ জন দোষীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিলেন বিচারক অমিতাভ মুখোপাধ্যায়। পাশাপাশি মৃত হরগোবিন্দ দাস ও চন্দন দাসের পরিবারকে ১৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। জানা গিয়েছে, সোমবার (২২ ডিসেম্বর) ১৩ জনকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল মহকুমা আদালত। মঙ্গলবার দোষীদের সাজা শোনাল আদালত। জানা গিয়েছে, ১৩ জন দোষী হলো- দিলদার নদাব (২৮), আসমাউল নদাব ওরফে কালু (২৭), ইনজামুল হক ওরফে বাবলু (২৭) , জিয়াউল হক (৪৫), ফেকারুল শেখ (২৫), আজফারুল শেখ ওরফে বিলাই (২৪) , মণিরুল শেখ ওরফে মনি (৩৯), ইকবাল শেখ (২৮) , নুরুল ইসলাম (২৩), সাবা করিম (২৫), হজরত শেখ (৩৬), আকবর আলি (৩০) , ইউসুফ শেখ (৪৯)।
প্রসঙ্গত, গত এপ্রিলে সংশোধিত ওয়াকফ আইনের প্রতিবাদে পথে নেমে বিক্ষোভে শামিল হন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মতো বঙ্গেও তার সাময়িক আঁচ পড়ে। ওয়াকফ আইনের প্রতিবাদে উত্তাল হয়েছিল মুর্শিদাবাদ। অশান্তি ছড়িয়ে পড়ে সুতি, সামশেরগঞ্জ বেশ কিছু এলাকায়। সেই সময়েই গত ১২ এপ্রিল কুপিয়ে খুন করা হয়েছিল সামশেরগঞ্জে থানার জাফরাবাদ গ্রামের বাসিন্দা হরগোবিন্দ দাস এবং তাঁর ছেলে চন্দন দাসকে। যদিও ওয়াকফ হিংসার সঙ্গে বিন্দুমাত্র সম্পর্ক ছিল না ওই হত্যাকাণ্ডের। রাজ্য পুলিশ জানিয়েছিল, খুনের নেপথ্য কারণ ছিল ব্যক্তিগত শত্রুতা। হত্যাকাণ্ডের পিছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না।
প্রশাসন সূত্রে খবর, এই জোড়া খুনের তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করা হয়েছিল। তদন্তে নেমে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে তদন্তকারীরা। পুলিশের চার্জশিট পেশ হতেই বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়। সরকারি আইনজীবীর দাবি, ঘটনার ৫৫ দিনের মাথায় মহকুমা আদালতে চার্জশিট পেশ হয়েছে। ৯৮৩ পৃষ্ঠার চার্জশিটে ঘটনার ক্রম এবং অপরাধের প্রকৃতি বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়েছিল। এরপর বেশ কয়েক মাস ধরে শুনানি চলার পর ১৬ ডিসেম্বর শুনানি শেষ হয়। সোমবার (২২ ডিসেম্বর) ১৩ জন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত।

মঙ্গলবার রায় ঘোষণার সময় আদালত বলেছে, ৩৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য, ফরেনসিক প্রমাণ, পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য নথিপত্রের প্রমাণের মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগগুলো প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। বিচারের সময় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যকে রাষ্ট্রপক্ষের মামলাকে শক্তিশালী করেছে। এদিন বিচারক জানিয়েছেন, কোনও রাজনৈতিক কারণ নয়, ব্যক্তিগত কারণেই এই খুন।
গোটা বিচারপ্রক্রিয়াকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মানবাধিকার সংগঠন গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি (এপিডিআর)। সংগঠনের জেলা সম্পাদক রাহুল চক্রবর্তী ডেইলি ডোমকল-কে বলেছেন, “ওয়াকফ আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে এক যুবকের মৃত্যু হয়। আরও বেশকয়েকজন গুলিতে আহত হয়। তাদের কোনো বিচার হল না। কিন্তু খুনের ঘটনায় খুব দ্রুততার সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়া শেষ করা হল এবং দোষীদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হল। আমার মনে হচ্ছে- আদালত রাজনৈতিক ভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে এই ধরণের রায় দিয়েছে।”
এদিকে সাজা ঘোষণা নিয়ে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ফাঁসির রায় হওয়া উচিত ছিল। এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সর্বোচ্চ আদালতে যাওয়ার কথাও বলেছেন বিরোধী দলনেতা।
