নিজস্ব সংবাদদাতা, বহরমপুর: সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা (UPSC)-এ প্রথম প্রচেষ্টাতেই উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে জেলার মুখ উজ্জ্বল করলেন সাগরদিঘির কাবিলপুর গ্রামের কৃষক কন্যা সানা আজমি। ২০২৫ সালের ইউপিএসসি পরীক্ষায় তিনি সারা দেশের মেধাতালিকায় অল ইন্ডিয়া র্যাঙ্ক ৭৬৪ অর্জন করেছেন। শুক্রবার ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই সানার এই সাফল্যে খুশির হাওয়া বইছে তাঁর পরিবার, বন্ধু-বান্ধব এবং গোটা জেলার মানুষের মধ্যে।
মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘি ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রাম কাবিলপুরের বাসিন্দা বছর পঁচিশের সানা আজমি সাধারণ কৃষক পরিবারের মেয়ে। তাঁর বাবা মাইজুদ্দিন সেখ দীর্ঘদিন ধরেই স্বপ্ন দেখতেন, তাঁর মেয়েরা বড় হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠবে। সেই স্বপ্ন পূরণে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে গিয়েছেন। অবশেষে সানা দেশের অন্যতম কঠিন পরীক্ষায় সাফল্যের মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্নের পূরণ করলেন।
জানা গিয়েছে, সানা আজমির পরিবারে সাত বোন ও তিন ভাই। শিক্ষার প্রতি পরিবারের আগ্রহ ছিল প্রবল। সানার এক বোন ইতিমধ্যেই এমডি ডাক্তার, আরেক বোন বর্তমানে মেডিক্যালের ছাত্রী। সেই পরিবারেরই সবার ছোট সানা এবার দেশের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোর অন্যতম ইউপিএসসি-তে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হলেন। ভবিষ্যতে তাঁর লক্ষ্য আইপিএস অফিসার হওয়া এবং প্রশাসনিক পদে থেকে দেশের মানুষের সেবা করা। নিজের সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে তাঁর বক্তব্য, আমি নিয়মিত কঠোর পরিশ্রম করেছি। অবশেষে সেই পরিশ্রমের ফল পেয়েছি। আমার বাবা-মায়ের খুব ইচ্ছে ছিল আমি সরকারি চাকরি করি। আজ তাঁদের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। এই সাফল্য আমার বাবা-মা এবং শিক্ষকদের।
পরিবার সূত্রে খবর, শিক্ষাজীবনের শুরু ধুলিয়ানের রহমানিয়া অ্যাকাডেমি থেকে। সেখান থেকেই তিনি মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ২০১৯ সালে আল-আমিন মিশন থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি দিল্লিতে পাড়ি দেন এবং সেখানে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। দিল্লিতেই থেকে তিনি ইউপিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেন এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করেন। কৃতী ছাত্রীর বাবা মাইজুদ্দিন সেখ ‘ডেইলি ডোমকল’-কে জানান, সানার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কঠোর অধ্যবসায়। তাঁর কথায়, “মেয়ে সবসময় পড়াশোনার মধ্যেই থাকত। অন্য দিকে মন দিত না। দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা পড়াশোনা করত।”
অন্যদিকে সানার মা বলেন, “মেয়েকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, আজ তা পূরণ হয়েছে। সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও কখনও ছেলে-মেয়েদের তা বুঝতে দিইনি। তাদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে কোনও খামতি রাখিনি।”
সাগরদিঘির প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে জাতীয় স্তরের এই কঠিন পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করা নিঃসন্দেহে বড় কৃতিত্ব। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সানা আজমির এই সাফল্য এলাকার তরুণ প্রজন্মের কাছে এক বড় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে অভিনন্দন জানাতে শুরু করেছেন বহু মানুষ। মুর্শিদাবাদের এই কৃতি কন্যা এখন অনেকের কাছেই পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং স্বপ্নপূরণের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
