ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: বর্তমান যুগে শৈশবের সংজ্ঞাটাই যেন বদলে গিয়েছে। খেলার মাঠের ধুলোবালির বদলে এখন শিশুদের হাতে শোভা পায় চকচকে স্মার্টফোন। কিন্তু এই ‘ডিজিটাল বিপ্লব’ কি আসলে নিঃশব্দে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে? বৃহস্পতিবার সংসদে পেশ করা ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের আর্থিক সমীক্ষা (Economic Survey) রিপোর্টে এই প্রশ্নই জোরালোভাবে উঠেছে। রিপোর্টে পরিষ্কার জানানো হয়েছে, শিশু ও কিশোরদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ‘ডিজিটাল আসক্তি’ (Digital Addiction) দেশের জন্য এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে বয়স ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ এবং অনলাইন পঠনপাঠন কমিয়ে দেওয়ার মতো একাধিক কড়া ব্যবস্থার সুপারিশ করেছে সরকার।
ডিজিটাল আসক্তি: এক গোপন মহামারী
আর্থিক সমীক্ষা অনুযায়ী, স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেটের অতিব্যবহার এখন কেবল একটি অভ্যাস নয়, বরং এটি একটি গভীর মানসিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ার নেশা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে উদ্বেগ (Anxiety), অবসাদ (Depression), হীনম্মন্যতা এবং ঘুমের অভাব তৈরি করছে। বিশেষ করে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে এই সমস্যা সবথেকে বেশি। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এখন ‘গেমিং ডিসঅর্ডার’-কে একটি আন্তর্জাতিক রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভারতেও এই নেশা মারাত্মক আকার নিচ্ছে, যা তরুণদের শিক্ষাগত পারফরম্যান্স এবং কর্মক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
সমীক্ষায় সুপারিশ
অর্থনৈতিক সমীক্ষায় ডিজিটাল আসক্তি রুখতে বহুমুখী পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। সেগুলি হল-
১. সমীক্ষায় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যে, নির্দিষ্ট বয়সের নিচে শিশুদের সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বা সীমা থাকা উচিত। প্রযুক্তি সংস্থাগুলোকে কঠোরভাবে ‘এজ ভেরিফিকেশন’ বা বয়স যাচাইকরণ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
২. কোভিড-১৯ অতিমারির সময় অনলাইন পঠনপাঠনের যে আধিপত্য শুরু হয়েছিল, এখন তা কমিয়ে অফলাইন শিক্ষায় জোর দেওয়ার কথা বলেছে সরকার। অতিরিক্ত অনলাইন ক্লাস শিশুদের স্ক্রিন টাইম বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা তাদের আসক্তিতে সাহায্য করছে।
৩. শিক্ষার জন্য শিশুদের দামী স্মার্টফোনের বদলে সাধারণ ফোন বা কেবল ‘এডুকেশন-অনলি’ ট্যাবলেট ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই ডিভাইসগুলিতে কন্টেন্ট ফিল্টার থাকবে, যাতে তারা কোনওভাবেই পর্নোগ্রাফি বা জুয়ার অ্যাপের সংস্পর্শে না আসতে পারে।
৪. স্কুলগুলিতে সাইবার নিরাপত্তা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার অংশ হিসেবে ‘ডিজিটাল ওয়েলনেস’ পাঠ্যক্রম চালু করার সুপারিশ করা হয়েছে।
৫. মেটা বা গুগলের মতো বড় সংস্থাগুলিকে তাদের অ্যালগরিদমে বদল আনতে হবে। বিশেষ করে ‘অটো-প্লে’ ফিচার এবং শিশুদের টার্গেট করে বিজ্ঞাপন দেখানো বন্ধ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার পথে কি ভারত?
সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া সরকার ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার ঐতিহাসিক আইন পাশ করেছে। ভারতের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা (CEA) ভি অনন্ত নাগেশ্বরন এক সাংবাদিক বৈঠকে জানান যে, ভারত সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞার কথা এখনও ভাবছে না, তবে অন্ধ্রপ্রদেশ ও গোয়ার মতো রাজ্যগুলি ইতিমধ্যেই এই ধরনের পলিসি তৈরির কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছে। তিনি বলেন, “এটি কেবল সরকারের কাজ নয়; সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অভিভাবকদেরও বড় ভূমিকা পালন করতে হবে।”
অভিভাবক ও পরিবারের ভূমিকা: দাওয়াই ‘ডিজিটাল ডায়েট’
সমীক্ষায় অভিভাবকদের জন্য বিশেষ ওয়ার্কশপ করার কথা বলা হয়েছে। পরিবারগুলিতে ‘ডিজিটাল ডায়েট’ চালুর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে থাকবে:
১. নির্দিষ্ট সময় অন্তর ফোন ছাড়া সময় কাটানো।
২. খাওয়ার সময় বা ঘুমানোর আগে বাড়িতে ‘ডিভাইস ফ্রি জোন’ তৈরি করা।
৩. শিশুদের সামনে বড়দের ফোন ব্যবহারের অভ্যাস কমানো।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও ইন্টারনেট পরিষেবা
রিপোর্টে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত হস্তক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। সেটি হলো নেটওয়ার্ক লেভেলে নিয়ন্ত্রণ। ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলি (ISP) এমন বিশেষ ‘ফ্যামিলি ডেটা প্ল্যান’ দিতে পারে যেখানে শিক্ষামূলক কাজের জন্য আনলিমিটেড ডেটা থাকলেও বিনোদন বা গেমিং অ্যাপের জন্য নির্দিষ্ট কোটা থাকবে।
২০২৫-২৬-এর অর্থনৈতিক সমীক্ষা ভারতের সামনে এক সতর্কবার্তা। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার স্বপ্ন সফল করতে গিয়ে আমরা যেন আমাদের মানবিক পুঁজি ও মানসিক স্বাস্থ্যকে বিসর্জন না দিই, সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সোশ্যাল মিডিয়ায় বয়সের বেড়ি আর অনলাইন ক্লাসে রাশ টানা—সরকারের এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে হয়তো শৈশব আবার ফোনের পর্দা থেকে মুক্তি পেয়ে খেলার মাঠে ফিরবে।
