ডেইলি ডোমকল, কলকাতা: রাজ্যে চলমান স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিন কমিশনকে সতর্ক করে তিনি বলেন, এই বিতর্কিত প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে “গণহারে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া” এবং ভারতের গণতান্ত্রিক ভিত্তির উপর “অপূরণীয় ক্ষতি” ডেকে আনতে পারে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যে এসআইআর পরিচালনার ক্ষেত্রে অনিয়ম, প্রক্রিয়াগত লঙ্ঘন ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, এই পুরো প্রক্রিয়া “অপরিকল্পিত, অপ্রস্তুত এবং খাপছাড়া” পদ্ধতিতে চালানো হচ্ছে। চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন, “এসআইআর প্রক্রিয়া গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং এটি আমাদের গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামো ও সংবিধানের চেতনার উপর সরাসরি আঘাত হানছে।” তিনি অভিযোগ করেন, “অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো” এবং “যথাযথ প্রস্তুতির অভাব”-এর ফলে গুরুতর ত্রুটি দেখা দিয়েছে—যার মধ্যে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ আইটি ব্যবস্থা, পরস্পরবিরোধী নির্দেশিকা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ।
মুখ্যমন্ত্রীর মতে, এই সব ঘাটতির ফলে ‘গুরুত্বপূর্ণ এই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি এক প্রহসনে পরিণত হয়েছে’ এবং ভোট প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “বর্তমান রূপে এসআইআর চালু থাকলে তা অপূরণীয় ক্ষতি, ব্যাপক ভোটার বঞ্চনা এবং গণতান্ত্রিক ভিত্তির উপর আঘাত ডেকে আনবে।” চার পাতার চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও উল্লেখ করেন, যদিও এই প্রক্রিয়াকে সময়সীমাবদ্ধ বলা হচ্ছে, বাস্তবে কোনও স্পষ্ট, স্বচ্ছ বা অভিন্ন সময়সূচি নেই। বিভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে এবং সময়সীমা ইচ্ছেমতো বদলানো হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, এতে প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়াগত বোঝাপড়ার ঘাটতি স্পষ্ট। তিনি বলেন, “অত্যন্ত উদ্বেগজনকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ প্রায় প্রতিদিনই দেওয়া হচ্ছে—অনেক সময় হোয়াটসঅ্যাপ বা টেক্সট মেসেজের মতো অনানুষ্ঠানিক মাধ্যমে।”
মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন কমিশনের কাছে অবিলম্বে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। অন্যথায় এই “খামখেয়ালি ও অপরিকল্পিত প্রক্রিয়া” বন্ধ করার দাবি তুলেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। এসআইআর সংক্রান্ত শুনানি প্রক্রিয়াতেও কড়া আপত্তি তুলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, নির্দিষ্ট কোনও কারণ না জানিয়ে ভোটারদের শুনানিতে ডাকা হচ্ছে, যা অকারণে আতঙ্ক ও হয়রানির সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, “বয়স্ক, অসুস্থ ও গুরুতর রোগে আক্রান্ত নাগরিকদেরও রেহাই দেওয়া হচ্ছে না। অনেক ভোটারকে ২০–২৫ কিলোমিটার দূরে যাতায়াত করতে বাধ্য করা হচ্ছে, কারণ শুনানিগুলি বিকেন্দ্রীকরণের বদলে অযৌক্তিকভাবে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তি হচ্ছে।”
শুনানির সময় বুথ-লেভেল এজেন্টদের (BLA) উপস্থিতি না থাকার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, এতে এসআইআর-এর “ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা” নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। নির্বাচন কমিশনের উপর দায়িত্ব চাপিয়ে তিনি বলেন, কমিশনের তত্ত্বাবধান বা নির্দেশে যদি কোনও বেআইনি, খামখেয়ালি বা পক্ষপাতদুষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে থাকে, তার জন্য নির্বাচন কমিশনকেই “সম্পূর্ণভাবে দায়বদ্ধ” হতে হবে। উল্লেখ্য, এর আগেও মুখ্যমন্ত্রী এসআইআর প্রক্রিয়াকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-র সাহায্যে চালানো এক “বড় কেলেঙ্কারি” বলে আক্রমণ করেছিলেন। গরিব মানুষদের এই প্রক্রিয়ার নামে “নির্যাতন” করা হচ্ছে বলেও সরব হয়েছিলেন তিনি।
