——————————————————————————-
সুরাইয়া সুমি সরকার
মানবজীবনের আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণের জন্য যে সময়গুলো বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, পবিত্র মাহে রমজান তার মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম রোজা—যা কেবল খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকার নাম নয়; বরং আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহভীতির এক গভীর সাধনা। রমজান আমাদের শেখায়, মানুষের প্রকৃত উন্নতি বাহ্যিক ভোগে নয়, বরং অন্তরের পরিশুদ্ধতায়। তাই রমজানকে কেবল একটি ধর্মীয় আচার হিসেবে নয়, একটি নৈতিক ও সামাজিক সংস্কার আন্দোলন হিসেবেও দেখা উচিত।
রমজানের আধ্যাত্মিক গুরুত্ব
রমজান মাসেই নাজিল হয়েছে পবিত্র কোরআন—মানবজাতির জন্য হেদায়েতের গ্রন্থ। তাই এই মাসের প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদতের জন্য বিশেষভাবে মূল্যবান। রোজা মানুষকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সহায়তা করে; কারণ ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করার মাধ্যমে মানুষ উপলব্ধি করে দরিদ্রের দুঃখ, অসহায়ের কষ্ট। এ এক আত্মিক অনুশীলন, যা অহংকার ভেঙে বিনয় শেখায়। রোজার মূল লক্ষ্য তাকওয়া অর্জন—অর্থাৎ আল্লাহর ভয় ও সচেতনতা। একজন রোজাদার যখন একান্ত নির্জনে থেকেও খাবার থেকে বিরত থাকে, তখন সে বুঝতে শেখে, তার প্রতিটি কাজের সাক্ষী একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। এই উপলব্ধিই মানুষকে পাপ থেকে বিরত রাখে এবং নৈতিকতার পথে স্থির রাখে।
আত্মসংযমের শিক্ষা
রমজানের অন্যতম বড় শিক্ষা আত্মসংযম। সারাদিন ক্ষুধা-পিপাসা সহ্য করা কেবল শারীরিক অনুশীলন নয়; বরং মন, চোখ, কান, জিহ্বা—সব ইন্দ্রিয়কে সংযত রাখার প্রশিক্ষণ। মিথ্যা, গীবত, অপবাদ, রাগ, হিংসা—এসব থেকে বিরত থাকাই প্রকৃত রোজার দাবি। আজকের ভোগবাদী সমাজে মানুষ সীমাহীন ভোগের দিকে ধাবিত। রমজান সেই প্রবণতার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিবাদ। এটি মানুষকে শেখায়—অল্পে তুষ্ট থাকা, নিয়ন্ত্রণে থাকা এবং আত্মশাসন গড়ে তোলা। ব্যক্তি যদি এই শিক্ষাকে স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত করতে পারে, তবে সমাজে অপরাধ, দুর্নীতি ও অসংযম অনেকটাই কমে আসবে।
সামাজিক সমতা ও সহমর্মিতা
রমজান কেবল ব্যক্তিগত সাধনার মাস নয়; এটি সামাজিক সমতারও প্রতীক। ধনী-গরিব সবাই একইভাবে ক্ষুধা অনুভব করে, একইভাবে ইফতার করে। ইফতার মাহফিল, দান-সদকা, যাকাত—এসব কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজে সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হয়। রমজান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সম্পদ এককভাবে ভোগের জন্য নয়; বরং ভাগাভাগির জন্য। যারা সচ্ছল, তাদের দায়িত্ব দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানো। সমাজে বৈষম্য কমাতে রমজানের এই দানের চেতনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমরা সত্যিকার অর্থে রমজানের শিক্ষা অনুসরণ করি, তবে ক্ষুধামুক্ত ও সহানুভূতিশীল সমাজ গড়া সম্ভব।
রমজানে করণীয় কর্তব্য
রমজানের গুরুত্ব উপলব্ধি করার পাশাপাশি কিছু করণীয় কর্তব্য রয়েছে, যা পালনের মাধ্যমে এই মাসের পূর্ণ সুফল অর্জন করা যায়।
১. ইবাদত বৃদ্ধি করা: নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া—এসব ইবাদত রমজানে বহুগুণ সওয়াবের। বিশেষ করে তারাবিহ ও তাহাজ্জুদ নামাজ আত্মিক উন্নতিতে সহায়ক। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় কোরআন পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
২. চরিত্র শুদ্ধ করা: রমজানের প্রকৃত উদ্দেশ্য চরিত্র গঠন। তাই মিথ্যা, প্রতারণা, গীবত, অশ্লীলতা, অন্যায় লেনদেন থেকে বিরত থাকা জরুরি। ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা, কথাবার্তায় নম্রতা ও আচরণে সৌজন্য বজায় রাখা রোজারই অংশ।
৩. দান-সদকা ও যাকাত আদায়: রমজান দানের মাস। দরিদ্র, এতিম, অসহায় ও প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। যাদের ওপর যাকাত ফরজ, তাদের উচিত যথাযথভাবে তা আদায় করা। দান কেবল সম্পদ কমায় না; বরং হৃদয়কে উদার করে।
৪. সময়ের সদ্ব্যবহার: রমজান আত্মশুদ্ধির কর্মশালা। তাই অযথা সময় নষ্ট না করে ইবাদত, জ্ঞানার্জন ও আত্মসমালোচনায় সময় ব্যয় করা উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় সময় ব্যয় না করে আত্মউন্নয়নে মনোযোগী হওয়া দরকার।
৫. খাদ্যে সংযম: দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রে রমজান ভোগের মাসে পরিণত হয়েছে। অতিরিক্ত ইফতার, অপচয় ও বিলাসিতা রমজানের চেতনার পরিপন্থী। রোজার লক্ষ্য ক্ষুধা অনুভব করা; ভোজন উৎসব নয়। সংযমী খাদ্যাভ্যাস শরীর ও আত্মা—উভয়ের জন্যই উপকারী।
৬. পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক মজবুত করা: রমজান ক্ষমা ও সম্পর্ক পুনর্গঠনের সময়। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ, প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া, দ্বন্দ্ব মিটিয়ে ফেলা—এসব কাজ রমজানের চেতনাকে বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত করে।
সমকালীন প্রেক্ষাপটে রমজানের শিক্ষা
বর্তমান সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, ভোগবাদ ও স্বার্থপরতা বাড়ছে। দুর্নীতি, সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতা মানুষের জীবনকে অস্থির করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে রমজানের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আত্মসংযম, সহমর্মিতা ও নৈতিকতার চর্চা যদি ব্যক্তি ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে অনেক সামাজিক সমস্যার সমাধান সম্ভব। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য রমজান আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখার এক সুবর্ণ সুযোগ। প্রযুক্তি-নির্ভর জীবনে মানুষ ক্রমেই ধৈর্য হারাচ্ছে; রমজান সেই ধৈর্যের প্রশিক্ষণ দেয়। এটি শেখায়—মানুষ কেবল ভোগের জন্য সৃষ্টি হয়নি; তার জীবনের একটি আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যও আছে।
তাকওয়া, সংযম ও মানবিকতা
পবিত্র মাহে রমজান কেবল একটি ধর্মীয় সময়কাল নয়; এটি আত্মপরিবর্তনের আহ্বান। এই মাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার তাকওয়া, সংযম ও মানবিকতায়। রমজানের রোজা যদি কেবল ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যায়। অতএব আমাদের কর্তব্য—রমজানের শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করা এবং তা বছরজুড়ে জীবনে বাস্তবায়ন করা। সংযম, সততা, দানশীলতা ও সহমর্মিতা যদি আমাদের স্থায়ী চরিত্রে পরিণত হয়, তবে ব্যক্তি হবে পরিশুদ্ধ, পরিবার হবে শান্তিময়, সমাজ হবে ন্যায়ভিত্তিক। রমজান তখন কেবল একটি মাস নয়—একটি জীবনদর্শনে পরিণত হবে।
