——————————————————————————-
২০১৪ সালে কেন্দ্রের মসনদ দখল করে মোদি সরকার। তারপর থেকেই সাধারণ মানুষকে কাগজের লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সরকার। কাগজের জাঁতাকলে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়েছে, বেঁচে থাকার স্বাদ তারা ভুলে গেছে। এই কাগজের জাঁতাকলে সবথেকে বেশি যে সম্প্রদায়টি হেনস্থা, হয়রানি, আতঙ্ক, ভয়, মানিসক রোগাক্রান্ত, আত্মঘাতী ও মৃত্যু হয়েছে, তারা হল সংখ্যালঘু মুসলিমরা। সারা বছর ধরেই কখনো আধার কার্ড সংশোধন, কখনো এই কাগজের সঙ্গে ওই কাগজের লিঙ্ক, মোবাইল নম্বর লিঙ্ক, কখনো কেওয়াইসির। অথার্ৎ কাগজ লিঙ্ক করতে করতে জীবনের লিঙ্ক হারিয়ে যাচ্ছে। অস্বীকার করার জায়গা নেই, কাগজের লাইন মানেই মুসলমান। নথির জাঁতাকলে সবথেকে বেশি ছোটাছুটি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বা হচ্ছেন তারাই। কিন্তু প্রশ্ন হল, মুসলিমদের কাগজেই কেনো এত ভুল? চলুন মূল আলোচনায় আসা যাক।
বর্তমান রাজ্যে চলমান এসআইআর (ভোটার তালিকা সংশোধন) প্রক্রিয়া থেকে মুসলমান সমাজকে কয়েকটি জিনিস ভোটার তালিকার মতই নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ ও সংশোধন করতে হবে। একইসঙ্গে বেশকিছু শিক্ষা নিয়ে নিজেকে সচেতন করতে হবে।
এসআইআর-এর ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি’র জালে সবচেয়ে বেশি ফেঁসে গিয়েছেন মুসলিমরা। আজ কমিশনের দৈনিক এসআইআর সংক্রান্ত বুলেটিন বলছে, বাংলায় এসআইআর নোটিশ গণহারে শুধুমাত্র মুসলিমদের দেওয়া হয়েছে। শীর্ষে রয়েছে মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর ও মালদা। গোটা প্রক্রিয়া নিয়ে নানান প্রশ্ন রয়েছে, মুসলিম বলেই টার্গেট করা হচ্ছে, কমিশন মুসলিমদের ভোটাধিকার কাড়তে চাইছে ইত্যাদি অভিযোগ উঠেছে। তবে আজ এনিয়ে আলোচনা নয়।
✔️ঘটনাক্রম-১:
দেখুন ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি’র মানে হল ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’ বা ভুলভ্রান্তি। তরিকুলের ৬ ছেলে-মেয়ের কাগজে বাবার নাম ৬ রকমের। কেউ লাগিয়েছেন তরিকুল সেখ, কেউ লাগিয়েছেন তরিকুল মন্ডল, দুই বোনে লাগিয়েছেন তরিকুল আলী মন্ডল, আরেক ছেলে আবার লাগিয়েছেন তরিকুল সেখ মন্ডল। মানে ব্যাপারটা “যেমন খুশি তেমন সাঁজো” হয়ে গেছে। ফলে ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি’র জালে ৬ ছেলে-মেয়েই আটকে পড়বে। প্রত্যেকেই নোটিশ পাবে, শুনানিতে হাজিরা দিতে হবে। এবার শুনানি কেন্দ্রে গিয়ে কমিশনের কর্তাদের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ৬ ছেলে-মেয়েই সেখানেও “যেমন খুশি তেমন সাঁজো” করবে। কারণ এক ব্যক্তির পদবি ৪-৫ রকমের হওয়াটা তো অযৌক্তিক। সঙ্গে অস্বাভাবিক। গ্যাঁড়াকলটা এমন জায়গায় বেঁধেছে যে, কমিশন যে পদটিই সঠিক বলে ধরবে, তাতে কেউ না কেউ তো বাদ পড়বেই।
এমনই তরিকুলের হাজারো উদাহরণ রয়েছে। এখন প্রশ্ন হল, “যেমন খুশি তেমন সাঁজো” কিভাবে হল? ওই তো অসচেতনতা, অশিক্ষা আর কাগজের গুরুত্ব না বোঝা।
✔️ঘটনাক্রম-২:
সৈয়দ মুস্তাক রেজা আলী রহমান। উনি সাহেব তাঁর একমাত্র পুত্রের নাম রেখেছেন- শরীফ রহমান আহমেদ।
বাবা👉
সৈয়দ: Syed, Sayed, Syad, Saiyad, Saiyed
মুস্তাক: Mushtaq, Mustaq, Mostaq, Moshtaque, Mushtaque
রেজা: Reza, Reja
আলী: Ali
রহমান: Rahman, Rehman, Rohman, Rahaman
ছেলে👉
শরীফ: Sharif, Sherif, Shereef, Shreef
রহমান: Rahman, Rehman, Rohman, Rahaman
আহমেদ: Ahmed, Ahmad, Ahammed
আপাতত বোঝার জন্য ধরুন, আপনি একজন সরকারি কর্মী। মুস্তাক বাবু তাঁর পুত্রের জন্য ইনকাম সার্টিফিকেট আনতে গিয়েছেন। আপনি তাঁর নাম জিজ্ঞেস করলেন, উনি বললেন- সৈয়দ মুস্তাক রেজা আলী রহমান। আপনি তাঁর পুত্রের নাম জিজ্ঞেস করলেন, উনি বললেন- শরীফ রহমান আহমেদ।
এবার ‘সৈয়দ মুস্তাক রেজা আলী রহমান’ এবং ‘শরীফ রহমান আহমেদ’ নামের ইংরেজি বানানটা ঠিক কি লিখলেন বা লিখবেন? মোটামুটি ভাবে মুস্তাক বাবুর নাম ঠিকঠাক লিখলেও পুত্রের নাম ১০০% শতাংশ ভুল লিখেছেন বা লিখবেনই। কারণ, আপনি মৌখিক শুনে যে বানানটি সঠিক বলে মনে করেছেন, সেই বানান তার জন্ম বা স্কুল সার্টিফিকেটে নেই।
এখানে মূল বিষয় হল, নামের বানানটা এতটাই জটিল এবং কমপ্লিকেটেড যে, ভুল হওয়ার সম্ভবনা এবং প্রবণতা অধীক।
✔️ঘটনাক্রম-৩: Part-1
কন্যা সন্তান জন্ম নিল, বাবা-মা নাম রাখল- খাদিজা খাতুন। বাবা-মা নিরক্ষর, অতকিছু বোঝেন না। নাম রাখতে হয় রেখেছেন। এবার শিশুর জন্ম সার্টিফিকেট করতে হবে, সেমত পঞ্চায়েত/পুরসভায় আবেদন জমা দিলেন।
জন্ম সার্টিফিকেটে মেয়ের নাম লেখা হল- Khadija Khatun।
মেয়ে বড় হল স্কুলে ভর্তি করতে গেলেন। সেখানে মেয়ের নাম লেখা হল- Khadeeja Khatun।
পরে মেয়েটি মাধ্যমিকের রেজিস্ট্রেশন ফর্ম ফিলাপে লিখল- Khadijah Khatun। স্বাভাবিক ভাবেই M.P, H.S, B.A এবং M.A-এর মার্কসিট ও সার্টিফিকেটে Khadijah Khatun হল।
এখন কেউ যদি খাদিজার জন্ম সার্টিফিকেটাকে ঠিক ধরেন, তাহলে প্রাইমারী স্কুল এবং মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের কাগজগুলো ভুল। আবার যদি কেউ প্রাইমারী স্কুলের সার্টিফিকেটাকে ঠিক ধরেন, তাহলে সার্টিফিকেট এবং মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের কাগজগুলো ভুল। কেউ মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের এডমিট/সার্টিফিকেটকে ঠিক ধরেন, তাহলে জন্ম সার্টিফিকেট ও প্রাইমারী স্কুল সার্টিফিকেট ভুল। কোনদিকে যাবেন, যেদিকেই যাবেন ভুলেই হাবুডুবু খাবেন।
তিনটি ইংরেজি বানানের বাংলা উচ্চারণ একই। কোনওটা ভুল আর কোনটা ঠিক, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিতর্ক পিছনে ফেলে আপনাকে প্রথমেই ঠিক করতে হবে তিনটি বানানের মধ্যে আপনি কোনটা রাখতে চান। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে দেখা গেল, কন্যার জন্ম সার্টিফিকেট হাতে পাওয়ার পর গোটা বাজার চক্কর মেরে ড্যাং ড্যাং করতে করতে বাড়ি গেলেন। একটি বারও বানানটা ঠিকঠাক রয়েছে কিনা মিলিয়ে দেখলেন না। নিরক্ষর বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে বানান মিলিয়ে দেখার প্রশ্নই ওঠে না। মূল বিষয় দাঁড়াল, শিশুর প্রথম কাগজেই বাবা-মায়ের অসচেতনতা এবং শিক্ষিত না হওয়ায় ভুল দিয়েই শুরু হল ভুলের যাত্রা।
এবার আপনি প্রশ্ন তুলবেন, সব কাগজপত্র দেওয়া হয়েছিল, তারপরও ভুল কি করে হল? হইত সঙ্গে কিছু গালমন্দও করবেন। আপনার প্রশ্ন তোলা এবং ক্ষুদ্ধ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আপনাকে এটাও বুঝতে হবে, সরকারি কর্মীরা শুধু আপনার একটি কাজই করছেন না। প্রত্যেকদিন ওই রকম হাজার হাজার সার্টিফিকেট তাদের তৈরি করতে হয়। ফলে ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। এছাড়াও, একশ্রেণীর সরকারি কর্মী চেষ্টা করেন নির্ভুল করার, কিন্তু তারপরও তার অজান্তেই ভুলটা হয়। আরেক শ্রেনীর সরকারি কর্মী (যারা মনে করেন তিনিই বস) থাকেন, তারা মানুষকে হয়রানি ও হেনস্থা করে আনন্দ পান। তাদের কথা অন্য একদিন বিস্তারিত লিখব। সঙ্গে কিভাবে ‘বসগিরি’ ছোটাতে হয় সেটাও লিখব।
✔️ঘটনাক্রম-৩: Part-2
খাদিজা খাতুন (Khadija Khatun) মেধাবি ছাত্রী। বাবার অল্প রোজগারের কারণে মেয়েটি কষ্ট করে পড়াশোনা করেছেন। দারিদ্রকে জয় করে নিজের অদম্য ইচ্ছেয় উচ্চশিক্ষিত হয়েছেন। স্নাতকোত্তর (M.A) সম্পূর্ণ করে এবার পিএইচডিটা করে সরকারি চাকরি করবে ভাবছে খাদিজা। থাক অনেক হয়েছে, আর পড়াশোনা করতে হবে। বিয়েটা করে এবার আমাদের মুক্তি দে। বিয়ে হল খাদিজা খাতুনের।
বিয়ে হল মানেই- “খাদিজা খাতুন-Khadija Khatun” আজ থেকে হয়ে গেল “খাদিজা বিবি-Khadija Bibi”। শ্বশুর বাড়ি গিয়ে ভোটার কার্ড তৈরি হল। তাতে নাম লেখা হল “খাদিজা বিবি-Khadija Bibi”।
খাদিজার স্বামী মারা গেলেন, তিনি বিধবা হলেন। সঙ্গে সঙ্গেই “খাদিজা বিবি-Khadija Bibi” হয়ে গেলেন- “খাদিজা বেওয়া-Khadija Bewa”।
“খাদিজা বেওয়া-Khadija Bewa” মারা যাওয়ার পর তাঁর ছেলে-মেয়েরা আবার লিখবে- “মৃত খাদিজা বেওয়া-Late Khadija Bewa”।
“যেমন খুশি তেমন সাঁজো” কেমন লাগছে বলুন। একটি মেয়ের জন্মের পর থেকে তিন-চারবার নামের বদল। এই পরিস্থিতিতে খাদিজারা লাইনে দাঁড়াবে না তো কে দাঁড়াবে বলতে পারেন? খাদিজারা আতঙ্ক, ভয়, হয়রানি হবেন না তো কে হবেন?
এই খাদিজা যদি কালকে কোনও সরকারি চাকরির আবেদন করতে যান। স্কুলের যোগ্যতা সার্টিফিকেটের সঙ্গে অন্যান্য নথিপত্রের মিল না থাকার কারণে আগেই আবেদনপত্র বাতিল বলে গন্য হবে। এই খাদিজা যদি কালকে কোনও সরকারি প্রকল্পের জন্য আবেদন করেন, নথিপত্রের গড়মিল ও ভুলের কারণে আবেদন গ্রহণ নাও হতে পারে। কালকে খাদিজার ছেলে-মেয়েরা কোনও নথির কাজ করতে গেলে একই কারণে পদে পদে তাদেরও সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। ছেলে-মেয়েরাও অভিভাবকের ভুলের মাশুল দেবে, এসআইআর নোটিশ পাবে, নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়বে, বিরক্ত হবে, অভিভাবকের ভূমিকায় প্রশ্ন তুলবে। এগুলো ঘটবে।
এবার কেউ কি আমাকে একটু বোঝাবেন- “খাতুন-বিবি-বেওয়া” এই তত্ত্ব কোথায় থেকে এলো? এর পিছনে ঠিক কি যুক্তি রয়েছে? এর কোনও আইনি বৈধতা আছে কিনা? আমার স্বল্প জ্ঞান, এর কোনও গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব বা যুক্তি আমি খুঁজে পাইনি। সঠিক তথ্য কারো জানা থাকলে, আমি নিজেকে সমৃদ্ধ ও জ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে ভীষণ ভাবে আগ্রহী।
🔴এই ভুল থেকে বেরোনোর উপায়/করণীয় কী?🔴
🔹১) শিশুর নাম সহজ-সরল রাখুন। জটিলে গেলে জটিলতা বাড়বে।
🔹২) শিশুর নাম রাখার ক্ষেত্রে দুইয়ের অধিক শব্দ ব্যবহার না করলেই ভালো হয়। চেষ্টা করুন First Name & Last Name রাখার।
🔹৩) কোথাও নাম লেখার ক্ষেত্রে সচেতন হোন। কোনও কাজে নাম জিজ্ঞেস করলে প্রয়োজনে বানান সহ বলুন।
🔹৪) সরকারি কর্মীকে প্রয়োজনে সম্মানের সহিত সর্তক করুন, বানানটা একটু ঠিক করে লিখবেন স্যার।
🔹৫) ছেলে-মেয়েকেও নিজের ও বাবা-মায়ের নাম ও বানান সম্পর্কে সচেতন করুন।
🔹৬) আবেদনপত্র জমা দেওয়ার পর সার্টিফিকেট বা নথি হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বানান দেখে নিন।
🔹৭) সার্টিফিকেট বা নথিতে ভুল বানান প্রিন্ট বা লেখা হলে দ্রুত সরকারি কর্মীকে সংশোধন করে দিতে অনুরোধ করুন।
🔹৮) যে কোনও কাজে বা প্রয়োজনে ইংরেজির বানান অধিক ব্যবহার করুন। ক্ষেত্র বিশেষে বাংলাও করতে পারেন।
🔹৯) কোনও ব্যক্তিকে দিয়ে যে কোনও ফর্ম ফিলাপ করানোর ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রয়োজনীয় নথি তার হাতে দিন।
🔹১০) এখন সবকাজেই ফোন নম্বর অত্যান্ত প্রয়োজনীয়, সব জায়গায় পার্মানেন্ট ফোন নম্বর দিন। বারংবার নম্বর বদল বন্ধ করুন।
🔹১১) যুবকরা বিয়ে করলে বৌয়ের নাম (জন্ম সার্টিফিকেট ও এডমিট অনুযায়ী) যা সেটাই রাখুন।
🔹১২) বিয়ের পর ‘বিবি’ বা ‘বেওয়া’ যোগ করে নথি জটিল করবেন না। ‘বিবি’ ‘বেওয়া’ তত্ত্ব সম্পূর্ণরুপে বন্ধ করুন।
🔹১৩) জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একই নাম ও পদবি ব্যবহার করুন।
🔹১৪) অবশ্যই সচেতন বাবা-মা হোন, কাগজকে গুরুত্ব দিন।
🔹১৫) ছেলে-মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করুন।
পরিশেষে, অশিক্ষা আর অসচেতনতার কারণে যেন আমাদের ভোটাধিকার বা নাগরিক অধিকার বিপন্ন না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা প্রতিটি নাগরিকের আশু কর্তব্য। সচেতন না হলে লাইনের শেষ দেখা হয়তো কোনোদিনই সম্ভব হবে না।
(সামাজিক মাধ্যম থেকে সংগৃহীত।)
