
সাম্প্রতিক কালে ভারতের রাজনৈতিক ময়দান যে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে, তা হলো ধর্মীয় মেরুকরণ। উন্নয়নের খতিয়ান বা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার চেয়েও অনেক সময় বড় হয়ে উঠছে ‘পক্ষ-বিপক্ষ’ নির্বাচনের খেলা। কিন্তু এই যে বিভাজনের রাজনীতি, তার ভবিষ্যৎ আসলে কী? সম্প্রতি জনমানসে একটি গভীর উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে—আজ যা ধর্মীয় বিদ্বেষের রূপ নিয়েছে, কাল তা কি স্বজাতির অভ্যন্তরেই বিভেদের আগুন জ্বালাবে না?
ভারতের সামাজিক কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, বৈচিত্র্যের মধ্যেই এই দেশের শক্তি নিহিত। কিন্তু বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে যে, তারা সংখ্যালঘু বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও হিংসার বাতাবরণ তৈরি করে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোট ব্যাংক সুসংহত করতে চাইছে। সমালোচকদের মতে, এই ‘শত্রু’ খোঁজার রাজনীতি আসলে একটি অন্তহীন প্রক্রিয়া। আজ যদি ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সমাজকে খণ্ডিত করা হয়, তবে সেই বিভাজনের ক্ষুধা কোনো নির্দিষ্ট বিন্দুতে গিয়ে থামবে না।
ভয়টা এখানেই যে, যেদিন ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি তার প্রাসঙ্গিকতা হারাবে বা তথাকথিত ‘শত্রু’র অস্তিত্ব ম্লান হবে, সেদিন রাজনীতির কারবারিরা ক্ষমতার গদি টিকিয়ে রাখতে নতুন বিভাজন রেখা খুঁজবে। আর সেই রেখাটি হতে পারে হিন্দুদের নিজেদের মধ্যেই—উঁচু জাত বনাম নিচু জাত, অথবা তথাকথিত ‘বড় হিন্দু’ বনাম ‘ছোট হিন্দু’। বর্ণপ্রথা বা জাতপাতের যে ক্ষত ভারত দীর্ঘকাল ধরে বয়ে বেড়াচ্ছে, সেই পুরনো ক্ষতকে খুঁচিয়ে তোলা তখন রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির সহজতম উপায় হয়ে দাঁড়াবে।
ইতিহাস সাক্ষী আছে, যখনই কোনো শক্তি ঘৃণার ওপর ভিত্তি করে ক্ষমতা দখল করে, তারা টিকে থাকার জন্য ক্রমাগত নতুন নতুন লক্ষ্যবস্তু তৈরি করে। আজ যদি কোনো একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় নির্যাতনের শিকার হয়, তবে আগামীতে সেই একই চাকা ঘুরতে পারে সংখ্যাগুরু সমাজের প্রান্তিক মানুষদের ওপর।
তাই সময় এসেছে ভাবার—আমরা কি কেবল সাময়িক আবেগ আর ধর্মীয় পরিচয়ের মোহে নিজেদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছি? একে অপরের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিয়ে ক্ষমতা সুরক্ষিত রাখার এই মরণখেলায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষেরই পরাজয় নিশ্চিত। সম্প্রীতি রক্ষা করা কেবল নৈতিক দায়বদ্ধতা নয়, বরং এটিই হলো ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক শোষণের হাত থেকে বাঁচার একমাত্র রক্ষাকবচ। ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে বাঁচাতে হলে বিভাজনের বদলে ঐক্যের পথেই হাঁটতে হবে, নতুবা আজকের নীরবতা আগামী দিনের সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
