TOP NEWS

দাক্ষিণাত্যে সংখ্যালঘু রাজনীতির নতুন সমীকরণ

ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সংখ্যালঘু অধিকারকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলির অবস্থান ও শব্দচয়নে এক বড়সড় বদল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘকাল ধরে মূলধারার দলগুলি কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের নাম সরাসরি উচ্চারণ না করে ‘সংখ্যালঘু’র মতো একটি বিস্তৃত ও নিরাপদ শব্দ ব্যবহার করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত। কিন্তু সাম্প্রতিক জাতীয় ও আঞ্চলিক জোটগুলির অভ্যন্তরীণ আলোচনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, সরাসরি কথা না বলার এই প্রবণতা অনেক সময়ই মূল সমস্যাগুলিকে হালকা বা লঘু করে দেয়। বিশেষত দক্ষিণ ভারতে এই ভাবনার পরিবর্তন এখন কেবল দলীয় আলোচনার স্তরে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ক্ষমতার প্রকৃত অংশীদারিত্বে রূপ নিতে শুরু করেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে কেবল একটি বিশ্বস্ত ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে ব্যবহার করে মূল রাজনীতির বাইরে ফেলে রাখার পুরনো কৌশলের অবসান ঘটিয়ে, একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে প্রকৃত রাজনৈতিক অংশীদারিত্বের এক নতুন রূপরেখা তৈরি হচ্ছে দাক্ষিণাত্যে।

২০২৬ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল রাজ্যের রাজনৈতিক পটভূমিতে এক নজিরবিহীন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই নির্বাচনে ‘তামিলগা ভেট্রি কড়গম’ (টিভিকে) একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও, একটি স্থিতিশীল সরকার গঠনের জন্য তাদের জোটের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। এই নতুন জোট সমীকরণের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে ‘ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ’। পাপানাসম আসন থেকে নবনির্বাচিত আইইউএমএল বিধায়ক এ এম শাহজাহান রাজ্যের ‘সংখ্যালঘু কল্যাণ মন্ত্রী’ হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এর মাধ্যমে এই প্রথম তামিলনাড়ু মন্ত্রিসভায় প্রবেশ করল আইইউএমএল। ভানিয়াম্বাড়ি আসন থেকে জয়ী সৈয়দ ফারুক বাশার সাথে কাঁধ মিলিয়ে শাহজাহান এখন কেবল একটি রাজনৈতিক ফ্রন্টকে বাইরে থেকে সমর্থন জোগানোর বদলে সরকারের নীতিনির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। বিগত কয়েক দশক ধরে তামিলনাড়ুতে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব বলতে বোঝাত বড় দ্রাবিড় দলগুলির ভেতর থেকে বেছে নেওয়া হাতেগোনা কয়েকজন স্বতন্ত্র নেতা। কিন্তু মন্ত্রিসভায় সরাসরি একটি স্বতন্ত্র, নিজস্ব পরিচিতি-ভিত্তিক দলের অন্তর্ভুক্তি প্রতীকী প্রতিনিধিত্বের যুগ শেষ করে প্রকৃত ক্ষমতার অংশীদারিত্বের রূপান্তরকে চিহ্নিত করে।

আইইউএমএল-এর এই রাজনৈতিক উত্থান বুঝতে গেলে কেরল এবং তামিলনাড়ুর সম্পূর্ণ ভিন্ন সামাজিক ও জনপরিসংখ্যানের চিত্রটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কেরলে মুসলিম জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৬.৫৬ শতাংশ, যাদের একটি বড় অংশ মালাবার অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। এই মজবুত জনপরিসংখ্যানের ভিত্তিতেই আইইউএমএল বিগত কয়েক দশক ধরে ‘ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’ (ইউডিএফ)-এর দ্বিতীয় বৃহত্তম শরিক হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। কেরলে এই দল নিয়মিতভাবে শিক্ষা, শিল্প এবং গণপূর্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্ব সামলেছে এবং কট্টরপন্থী দলগুলিকে দূরে রেখে অঞ্চলের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক পরিকাঠামো উন্নয়নে নেতৃত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে, তামিলনাড়ুতে মুসলিম জনসংখ্যা মাত্র ৫.৮৬ শতাংশ এবং এই জনসংখ্যা বেশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। তবে ভানিয়াম্বাড়ি, আম্বুর, কায়ালপত্তনম, রামানাথপুরম, তাঞ্জাভুর এবং তিরুচিরাপল্লীর মতো নির্দিষ্ট কিছু পকেটে তাঁদের শক্তিশালী নির্বাচনী প্রভাব রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে, তামিল মুসলিমরা মূলত দ্রাবিড় পরিচিতির সাথে নিজেদের একাত্ম করেছিলেন এবং দ্রাবিড় দলগুলির ধর্মনিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্মকেই নিরাপদ মনে করতেন। পরবর্তীতে ‘মণিথানায়া মক্কাল কাচ্চি’ এবং অন্যান্য আঞ্চলিক দলের উত্থানের ফলে মুসলিম ভোট কিছুটা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল।

২০২৬ সালের নির্বাচন প্রমাণ করেছে, কোনও রাজ্যে একটি সম্প্রদায় সংখ্যায় কম হলেও, জোট রাজনীতির ব্যবহারিক ও বাস্তবসম্মত প্রয়োগের মাধ্যমে প্রশাসনে অংশীদারিত্ব আদায় করা সম্ভব। দক্ষিণ ভারতের এই রাজনৈতিক পথ উত্তর ও পশ্চিম ভারতের রাজ্যগুলির তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা। উত্তরপ্রদেশ এবং বিহারের মতো রাজ্যগুলিতে পুরনো ধর্মনিরপেক্ষ জোটগুলির ভাঙন সংখ্যালঘু ভোটারদের এক প্রকার রাজনৈতিকভাবে একাকী বা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। অতীতে প্রশাসনের ব্যর্থতা— যেমন ১৯৮৯ সালের বিহারের ভাগলপুর দাঙ্গা এবং পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ‘সাচার কমিটি রিপোর্ট’-এ উঠে আসা মুসলিমদের চরম অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত অনগ্রসরতা— উত্তর ভারতে একটি বড় নেতৃত্বহীনতার শূন্যতা তৈরি করেছিল। এই শূন্যতার সুযোগে সেখানে কিছু বিচ্ছিন্ন ও উগ্র পরিচয়-ভিত্তিক দলের জন্ম হয়। যা পরবর্তীতে পাল্টা হিসেবে সংখ্যাগুরু ভোটের মেরুকরণকে আরও তীব্র করে তোলে।

দক্ষিণে আইইউএমএল-এর কৌশলটি সম্পূর্ণ আলাদা। কেরালার ইউডিএফ হোক বা তামিলনাড়ুর নতুন টিভিকে নেতৃত্বাধীন জোট— সবসময় মূলধারার আঞ্চলিক জোটের অংশ থেকে তারা নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রেখেছে। এই যৌথ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কৌশলের কারণে বিরোধী দলগুলির পক্ষে আইইউএমএল-কে ‘একচেটিয়া’ বা ‘বর্জনকারী’ দল হিসেবে দেগে দেওয়া কঠিন হয়। কারণ তাদের রাজনৈতিক ম্যান্ডেট বা ক্ষমতা বহু-সাম্প্রদায়িক একটি জোটের সাথে যুক্ত। কেরলের পর এবার তামিলনাড়ুর মন্ত্রিসভায় আইইউএমএল-এর এই স্থান লাভ দক্ষিণ ভারতে সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্বের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করল। পাশাপাশি দুটি প্রতিবেশী রাজ্যে শক্তিশালী উপস্থিতি দলটিকে ভারতের সাংবিধানিক রাজনীতির কাঠামোর মধ্যে থেকে সংখ্যালঘু অধিকারের বিষয়ে কথা বলার একটি বড় প্ল্যাটফর্ম এনে দিয়েছে।

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার: নির্বাচনী হিসাবনিকাশ বা দ্বিধার কারণে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলি যখন কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রকৃত সমস্যাগুলি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তখন সেই সম্প্রদায় স্বাভাবিকভাবেই নিজের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর নিজেই খুঁজে নেওয়ার পথ খোঁজে। তবে দক্ষিণের এই সাম্প্রতিক মোড় দেখাল, এই স্বাধিকারের লড়াই রাজনৈতিক বিভাজনের দিকে না গিয়েও সফল হতে পারে। আঞ্চলিক জোট এবং সাংবিধানিক দরকষাকষির ওপর ভর করে নিজের ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখেও দেশের বৃহত্তর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!